নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে প্রায় ৩৩ লাখ টাকা মূল্যের ১৬ হাজার ৫০০ লিটার জেট ফুয়েলসহ একটি ট্যাংকলরি জব্দ করেছে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এ ঘটনায় ট্যাংকলরির চালক সাগর হোসেনকে (২৭) আটক করা হলেও গাড়ির মালিক আওয়ামী লীগ নেতা ইয়ার হোসেন ভূঁইয়া, তাঁর ভাতিজা ইরফান ভূঁইয়াসহ জ্বালানি তেল চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ ওঠা অন্যদের এখনো আইনের আওতায় আনা যায়নি।
গত শনিবার রাত ৯টার দিকে নারায়ণগঞ্জের চিটাগাং রোডের শিমরাইল মোড় এলাকা থেকে তেলবোঝাই ট্যাংকলরিটি জব্দ করা হয়। জব্দ করা গাড়ির নম্বর চট্ট-মেট্রো-৪১-০৮০৩। এ ঘটনায় তিনজনের নাম উল্লেখ করে এবং আরও দুজনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে মামলা হয়েছে বলে জানা গেছে।
মামলার এজাহারভুক্ত আসামিরা হলেন ট্যাংকলরির চালক সাগর হোসেন (২৭), হেলপার দ্বীন ইসলাম (৫২) এবং ট্যাংকলরির মালিক ইয়ার হোসেন ভূঁইয়া (৫০)। তাঁদের মধ্যে চালককে আটক করা হলেও বাকি আসামিরা পলাতক রয়েছেন।
বিষয়টি নিশ্চিত করে নারায়ণগঞ্জ জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নজরুল ইসলাম জানান, চিটাগাং রোড এলাকা থেকে ১৬ হাজার ৫০০ লিটার জেট ফুয়েলসহ একটি ট্যাংকলরি জব্দ করা হয়েছে। এ সময় চালককে আটক করা হয়। এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ট্যাংকলরির মালিক ইয়ার হোসেন ভূঁইয়াকে গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে জব্দ করা ট্যাংকলরির মালিক সিদ্ধিরগঞ্জের গোদনাইল বার্মাস্ট্যান্ড এলাকার বাসিন্দা ইয়ার হোসেন ভূঁইয়া। তিনি ঢাকা বিভাগীয় ট্যাংকলরি মালিক সমিতির গোদনাইল পদ্মা ডিপো শাখার সাবেক সাধারণ সম্পাদক। স্থানীয়দের দাবি, নাসিকের ৬ নম্বর ওয়ার্ড এলাকায় আওয়ামী লীগের সক্রিয় নেতা হিসেবে পরিচিত ইয়ার হোসেনকে অতীতে শামীম ওসমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি ও মিছিল-মিটিংয়ে দেখা গেছে।
জেট ফুয়েল চুরির সঙ্গে জড়িত একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটের বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা অভিযোগ উঠে আসছে। অভিযোগ রয়েছে, ইয়ার হোসেনের ভাতিজা ইরফান ভূঁইয়ার নেতৃত্বে একটি চক্র রূপগঞ্জ, শ্যামপুর ও গাজী ব্রিজসহ বিভিন্ন এলাকায় জেট-এ ওয়ান জ্বালানি তেলের কারসাজিতে জড়িত। এ ক্ষেত্রে কুর্মিটোলা ডিপোর কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশের অভিযোগও সামনে এসেছে। তাঁদের মধ্যে ডিপোর এভিয়েশন বিভাগের ডিজিএম অনুপ কুমার বড়ুয়া, ডিপো ইনচার্জ রেদোয়ান এবং স্টাফ আলমগীরের নাম উল্লেখ করা হচ্ছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এর আগে গোদনাইল পদ্মা অয়েল ডিপো থেকে রাজধানীর কুর্মিটোলা ডিপোতে নেওয়ার পথে ৭২ হাজার লিটার জেট ফুয়েল গায়েব হওয়ার অভিযোগে তদন্ত শুরু করে পদ্মা অয়েল পিএলসির একটি দল। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, বুধবার (১১ মার্চ) গোদনাইল ডিপো থেকে জেট ফুয়েল নিয়ে ছেড়ে যাওয়া অন্তত চারটি ট্যাংকলরি নির্ধারিত গন্তব্য কুর্মিটোলা ডিপোতে পৌঁছায়নি বলে অভিযোগ ওঠে।
গাড়িগুলোর নম্বর ছিল ৪১-০৭০০, ৪২-০২৫২, ৪১-০৬৪৯ ও ৪১-০৬৯৮। অভিযোগ অনুযায়ী, কাগজপত্রে গাড়িগুলো কুর্মিটোলা ডিপোতে পৌঁছেছে দেখানো হলেও বাস্তবে সেগুলোর জ্বালানি অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়। ওই ঘটনার তদন্তে সিদ্ধিরগঞ্জের ইরফান ভূঁইয়ার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ সামনে আসে। অভিযোগ রয়েছে, গ্রেপ্তার এড়াতে তিনি সে সময় দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, জেট ফুয়েলের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় জ্বালানি সম্পদ চুরির অভিযোগ শুধু বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; এর সঙ্গে একাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের যোগসাজশ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। এমন চক্রের কারণে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
এদিকে জেট ফুয়েল জব্দের ঘটনায় শ্রমিক নেতারা ইয়ার হোসেন ভূঁইয়া, ইরফান ভূঁইয়া ও তাঁদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে জ্বালানি চুরির সঙ্গে জড়িত অন্য ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা, সরকারি সম্পদের অপব্যবহার এবং সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতির বিষয়টি তদন্তের আওতায় নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।
Leave a Reply