তৈরি পোশাকশিল্পকে বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে উল্লেখ করে নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (নাউক) চেয়ারম্যান মাশুকুল ইসলাম রাজীব বলেছেন, শ্রমিকদের আবেগকে পুঁজি করে দেশের পোশাকশিল্প ধ্বংসের যে দেশি-বিদেশি অপচেষ্টা চালানো হয়েছিল, শ্রমিকদের সচেতনতা ও দায়িত্বশীল সিদ্ধান্তের কারণে তা ব্যর্থ হয়েছে। শিল্পের স্বার্থ ও নিজেদের জীবিকার বাস্তবতা অনুধাবন করে শ্রমিকরাই সেই ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে দিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) বিকেলে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের শিবু মার্কেট এলাকায় সাম্প্রতিক শ্রমিক অসন্তোষ ও শিল্পাঞ্চলের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।
মাশুকুল ইসলাম রাজীব বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তৈরি পোশাকশিল্পের অবদান অপরিসীম। আশির দশকে এ শিল্পের যাত্রা শুরুর পর দীর্ঘ পথপরিক্রমায় বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। দেশের লাখ লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান উৎস হয়ে উঠেছে এই খাত। ফলে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা অনেকের স্বার্থে আঘাত করেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিযোগিতার প্রসঙ্গ টেনে রাজীব বলেন, বাংলাদেশের পোশাকশিল্প যখন বিশ্ববাজারে নিজেদের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করার পথে, তখন প্রতিযোগী দেশগুলোর সুযোগ বাড়ছে। আগামী ডিসেম্বর থেকে একটি প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের পণ্যে আরোপিত ১২ শতাংশ শুল্ক প্রত্যাহার করে শূন্যে নামিয়ে আনার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, এমন গুরুত্বপূর্ণ সময়ে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পকে অস্থিতিশীল ও প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টা উদ্বেগজনক। তাঁর অভিযোগ, দেশি-বিদেশি একটি স্বার্থান্বেষী মহল শ্রমিক অসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছে।
শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবির বিষয়ে রাজীব বলেন, শ্রমিকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সরকার মজুরি বোর্ড গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে এবং ইতোমধ্যে প্রাথমিক সিদ্ধান্তও এসেছে। প্রধানমন্ত্রীর সময়োপযোগী ও দূরদর্শী নির্দেশনার কারণেই দ্রুত এ উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি আরও বলেন, সরকারের নেওয়া উদ্যোগ ও মজুরি বোর্ডের অগ্রগতির তথ্য সাধারণ শ্রমিকদের কাছে যথাযথভাবে পৌঁছাতে দেওয়া হয়নি বলে তাঁর অভিযোগ। বরং বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে শ্রমিকদের একটি অংশকে ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা হয়েছিল। তবে প্রকৃত পরিস্থিতি জানার পর সাধারণ শ্রমিকরা দায়িত্বশীল অবস্থান নিয়েছেন এবং কর্মস্থলে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
শ্রমিকদের ভূমিকার প্রশংসা করে নাউক চেয়ারম্যান বলেন, কারখানা সচল থাকলেই শ্রমিকদের কর্মসংস্থান ও নিয়মিত বেতন নিশ্চিত করা সম্ভব। কারখানা বন্ধ হয়ে গেলে মজুরি বৃদ্ধির দাবি তো দূরের কথা, নিয়মিত বেতন পাওয়াও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। তাই নিজেদের জীবিকা ও ভবিষ্যতের স্বার্থেই শিল্পকারখানা রক্ষায় শ্রমিকদের সচেতন ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর দাবি, সাধারণ শ্রমিকদের নাম ব্যবহার করে একটি স্বার্থান্বেষী মহল ও কিছু নিষিদ্ধ সংগঠন রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা করেছে।
জাতীয় অর্থনীতির স্বার্থে রাজনৈতিক বিভেদ ভুলে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে মাশুকুল ইসলাম রাজীব বলেন, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতেই পারে। কিন্তু দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি তৈরি পোশাকশিল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এমন কোনো কর্মকাণ্ড কারও জন্যই কল্যাণকর নয়। শিল্প, শ্রমিক ও জাতীয় অর্থনীতির স্বার্থে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম আজাদ, দেশের অন্যতম শীর্ষ রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান মডেল গ্রুপের কর্ণধার মাসুদুজ্জামান মাসুদসহ স্থানীয় প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী নেতা ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।
Leave a Reply