চট্টগ্রাম প্রতিনিধি:
চার বছর আগে ট্রাক দুর্ঘটনায় দুই হাত ও দুই পা অচল হয়ে কর্মক্ষমতা হারান মো. কুরবান আলী। একসময় ট্রাকের হেলপার হিসেবে দৈনিক মজুরিতে কাজ করে সংসার চালালেও দুর্ঘটনার পর থেকে চলাফেরার জন্যও অন্যের ওপর নির্ভরশীল তিনি। স্ত্রী ও একমাত্র মেয়েই এখন তাঁর দেখাশোনা করেন।
স্বাভাবিকভাবে চলাফেরার জন্য একটি ইলেকট্রিক হুইলচেয়ারের আবেদন নিয়ে বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের সাপ্তাহিক গণশুনানিতে হাজির হন কুরবান আলী। তাঁর অসহায়ত্বের কথা শুনে গণশুনানি চলাকালেই ইলেকট্রিক হুইলচেয়ার কিনে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। শুনানি শেষ হওয়ার আগেই হুইলচেয়ারটি এনে কুরবান আলীর হাতে তুলে দেওয়া হয়। পাশাপাশি তাঁকে আর্থিক সহায়তাও দেওয়া হয়।
যে হুইলচেয়ারের আশায় জেলা প্রশাসকের কাছে এসেছিলেন কুরবান, সেটি সঙ্গে নিয়েই সেদিন বাড়ি ফেরেন তিনি।
গণশুনানিতে কুরবান আলীর মতো আরও কয়েকজন অসহায় মানুষ চিকিৎসা ও আর্থিক সহায়তার আবেদন নিয়ে উপস্থিত হন। তাঁদের আবেদনের কথা শুনে প্রয়োজন অনুযায়ী তাৎক্ষণিক সহায়তা ও ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেন জেলা প্রশাসক।
হাটহাজারীর তানভীর হাসান তাঁর ক্যান্সারে আক্রান্ত মা রুবি আক্তারের চিকিৎসার জন্য সহায়তা চান। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে সিসিটিভি অপারেটর হিসেবে কর্মরত তানভীর জানান, সীমিত আয়ে মায়ের ব্যয়বহুল চিকিৎসার খরচ বহন করা তাঁর জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। তাঁর আবেদন শুনে জেলা প্রশাসক তাৎক্ষণিক আর্থিক সহায়তা দেন।
বাঁশখালীর মো. সেলিম উদ্দীন জন্মগত শারীরিক জটিলতা ও দৃষ্টিহীনতায় ভোগা ছেলে মো. শাহরিয়ার আদনানের উন্নত চিকিৎসার জন্য সহায়তা চান। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ছেলেকে ভারতে নিতে সাত থেকে আট লাখ টাকা প্রয়োজন বলে আবেদনে উল্লেখ করেন তিনি। মানবিক বিবেচনায় তাঁর আবেদন গ্রহণ করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়।
এ ছাড়া চিকিৎসার জন্য মিরসরাইয়ের আবদুল্লাহ আল ফয়সাল এবং প্রায় ২৭ বছর ধরে প্যারালাইসিস, মস্তিষ্ক ও মেরুদণ্ডের জটিল রোগে ভোগা নগরের ইপিজেড এলাকার মো. মুজিবুল আলমকেও আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ডান পা অচল হয়ে কর্মহীন হয়ে পড়া মো. ইউছুফকেও সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
গণশুনানিতে কেউ এসেছিলেন নিজের চিকিৎসার জন্য, কেউ ক্যান্সারে আক্রান্ত মায়ের চিকিৎসার ব্যয় বহনের আশায়, আবার কেউ দৃষ্টিহীন সন্তানের উন্নত চিকিৎসার জন্য। সংকটের ধরন ভিন্ন হলেও সবার প্রত্যাশা ছিল একই—দুঃসময়ে রাষ্ট্রের সহযোগিতা।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা একে একে তাঁদের সমস্যার কথা শোনেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী তাৎক্ষণিক সহায়তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেন।
একটি ইলেকট্রিক হুইলচেয়ার কুরবান আলীর অচল হাত-পা ফিরিয়ে দিতে না পারলেও তাঁর চলাফেরায় স্বস্তি এনে দিতে পারে এবং অন্যের ওপর নির্ভরশীলতা কিছুটা কমাতে পারে। একইভাবে তাৎক্ষণিক আর্থিক সহায়তা হয়তো দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার পুরো ব্যয় মেটানোর জন্য যথেষ্ট নয়, তবে সংকটের সময়ে অসহায় মানুষের পাশে রাষ্ট্রের দাঁড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়।
অসহায় মানুষের কথা সরাসরি শোনা এবং সম্ভব হলে অপেক্ষায় না রেখে তাৎক্ষণিকভাবে সহায়তার উদ্যোগ নেওয়ার কারণে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা অনেকের কাছে ‘মানবিক ডিসি’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন।
Leave a Reply