ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে নারায়ণগঞ্জে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন বিভিন্ন তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা। সোমবার (২ নভেম্বর) দুপুর ১২টা থেকে শুরু হওয়া এ কর্মসূচিতে শিবু মার্কেট, কাঠেরপুল, জালকুড়ি ও ভূঁইগড়সহ বিভিন্ন এলাকা থেকে শ্রমিকরা মিছিল নিয়ে শিবু মার্কেট এলাকায় জড়ো হন। পরে তারা ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের উভয় পাশ ও ওভারপাসে অবস্থান নিয়ে যান চলাচল বন্ধ করে দেন।
দীর্ঘ সময় সড়ক অবরোধের কারণে লিংক রোডের উভয় পাশে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েন দূর-দূরান্তের যাত্রী, পথচারী ও গণপরিবহনে চলাচলকারীরা। অনেক যাত্রীকে গাড়ি থেকে নেমে পায়ে হেঁটে গন্তব্যে যেতে দেখা যায়। আবার অনেকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানবাহনের ভেতরে আটকে থাকেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দুপুর ২টার দিকে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা সড়কে কাঠ ও টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। এ ঘটনায় আশপাশের এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় একটি কাভার্ড ভ্যান ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে বলে জানা গেছে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে শ্রমিকদের শান্ত করার চেষ্টা করলেও তারা অবরোধ অব্যাহত রাখেন।
বেলা আড়াইটার দিকে ভূঁইগড় এলাকায় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশ ও বিজিবি সদস্যদের মুখোমুখি অবস্থান তৈরি হয়। এর কিছুক্ষণ পর বৃষ্টি শুরু হলে শ্রমিকরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েন। প্রায় ৩০ মিনিট বৃষ্টির পর সাময়িকভাবে সড়কে যান চলাচল শুরু হলেও শিবু মার্কেট এলাকায় শ্রমিকরা পুনরায় জড়ো হলে আবারও যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
আন্দোলনরত শ্রমিকদের অভিযোগ, দ্রব্যমূল্য ও বাসাভাড়ার ঊর্ধ্বগতির কারণে বর্তমান বেতনে পরিবার নিয়ে জীবনযাপন করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়লেও সে অনুযায়ী তাদের আয় বাড়েনি। ফলে বাধ্য হয়েই ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে তারা আন্দোলনে নেমেছেন।
মেট্রো নিটিং অ্যান্ড ডাইং কারখানার শ্রমিক শহিদুল ইসলাম বলেন, তাঁর মাসিক বেতন ১২ হাজার ৫০০ টাকা। অথচ বাসাভাড়া দিতে হয় সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা। এক মাসের বাজার করতেই লাগে প্রায় ১০ হাজার টাকা। এর বাইরে চিকিৎসার একটি পরীক্ষা করাতে পাঁচ হাজার টাকা খরচ হয়। এত অল্প বেতনে সংসারের অন্যান্য খরচ কীভাবে মেটাবেন, সেই প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, তাঁদের একটাই দাবি—ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করতে হবে।
হাবিবুর রহমান নামে আরেক শ্রমিক বলেন, চার সদস্যের পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী তিনি। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে বর্তমান বেতনে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, ‘বাঁচার মতো বেতন দিতে হবে। আমরা কাজ করেই বাঁচতে চাই, কাজ ছাড়া তো টাকা চাই না। শহরে বাসাভাড়া কত, তা সবাই জানেন। আমাদের বেতন বাড়াতে না পারলে গ্যাস-বিদ্যুতের দাম ও দ্রব্যমূল্য কমিয়ে দেওয়া হোক। অন্যথায় বেতন ৩০ হাজার টাকা করতে হবে। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন থামাব না।’
এদিকে ঢাকা ও গাজীপুরে শ্রমিক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে হতাহতের ঘটনারও প্রতিবাদ জানান বিক্ষোভকারীরা।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ঘটনাস্থলে পৌঁছান নারায়ণগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম আজাদ, জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির এবং জেলা পুলিশ সুপার মো. হাবিবুর রহমান। তারা শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে অবরোধ প্রত্যাহারের আহ্বান জানান।
এ সময় পুলিশ সুপার মো. হাবিবুর রহমান বলেন, সরকার ইতোমধ্যে মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। এরপরও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষিপ্তভাবে শ্রমিক বিক্ষোভ হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও একটি স্বার্থান্বেষী মহল আন্দোলনে উসকানি দেওয়ার চেষ্টা করছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড বরদাশত করা হবে না। সাধারণ শ্রমিকদের পাশে পুলিশ রয়েছে এবং সরকার তাদের দাবির বিষয়টি বিবেচনা করবে। তিনি শ্রমিকদের কারও প্ররোচনায় বিভ্রান্ত না হওয়ার আহ্বান জানান।
জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির বলেন, শ্রমিকদের আশ্বস্ত করা হয়েছে যে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে যৌক্তিক সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে। ততক্ষণ পর্যন্ত শ্রমিকদের ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করার আহ্বান জানান তিনি। পাশাপাশি শ্রমিকদের ন্যায়সংগত দাবিগুলো সরকারের কাছে তুলে ধরার আশ্বাস দেন।
সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম আজাদ শ্রমিকদের উদ্দেশে বলেন, প্রধানমন্ত্রী সবার জন্য সহায়ক। আলোচনার মাধ্যমেই সবার সমস্যা সমাধান করা সম্ভব। শ্রমিকদের শ্রমের বিনিময়েই সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, শ্রমিকদের পাশে তারা রয়েছেন। কোনো মহলের উসকানির শিকার না হয়ে ধৈর্য ধরতে হবে।
এ বিষয়ে ফতুল্লা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মাহবুব আলম বলেন, বেতন বৃদ্ধির দাবিতে লিংক রোড অবরোধ করে রাখা শ্রমিকদের বিকেলে পুলিশ, বিজিবি ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বুঝিয়ে সড়ক থেকে সরিয়ে দেন।
পরে সংসদ সদস্য, জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের তৎপরতা এবং প্রশাসনের আশ্বাসে বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে শ্রমিকরা অবরোধ তুলে নিলে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়। প্রায় সাড়ে পাঁচ ঘণ্টার এই অবরোধে জনদুর্ভোগের পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের মজুরি ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে অসন্তোষের বিষয়টিও নতুন করে সামনে আসে।
Leave a Reply