ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে আন্দোলনরত পোশাকশ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের সিদ্ধিরগঞ্জের জালকুড়ি এলাকায় এ সংঘর্ষ হয়। এতে জেলা পুলিশ ও শিল্প পুলিশের অন্তত ৯ সদস্য আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। অন্যদিকে, শ্রমিকদের দাবি, সংঘর্ষে তাঁদের অন্তত ২১ জন আহত হয়েছেন। তাৎক্ষণিকভাবে আহতদের কারও পরিচয় জানা যায়নি।
এর আগে টানা দ্বিতীয় দিনের মতো দুপুর আড়াইটার দিকে ফতুল্লার শিবু মার্কেট এলাকায় সড়ক অবরোধ করেন কয়েক হাজার পোশাকশ্রমিক। বিকেল ৫টা পর্যন্ত চলা এ অবরোধে লিংক রোডে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের একাংশ সড়কে অগ্নিসংযোগ ও যানবাহন ভাঙচুর করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ার গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দুপুরে মধ্যাহ্নভোজের বিরতির পর ফতুল্লার কাঠেরপুল এলাকার আবীর ফ্যাশনের শ্রমিকেরা কারখানায় প্রবেশ না করে মূল ফটকের সামনে জড়ো হতে থাকেন। একপর্যায়ে পার্শ্ববর্তী মাইক্রো ফাইবার কারখানার শ্রমিকেরাও তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন। পরে ওই কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়। এরপর মেট্রো নিটওয়্যার ও আজাদ নিট কম্পোজিটের শ্রমিকেরাও কাজ বন্ধ করে আন্দোলনে যুক্ত হন।
দুপুর আড়াইটার দিকে কয়েক হাজার শ্রমিক মিছিল নিয়ে কাঠেরপুল থেকে শিবু মার্কেটের দিকে অগ্রসর হন। এ সময় পুলিশ প্রধান সড়কে প্রবেশের মুখে ব্যারিকেড দিয়ে তাঁদের বাধা দেয়। তবে শ্রমিকেরা ব্যারিকেড অতিক্রম করে মূল সড়কে অবস্থান নিলে লিংক রোডে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে সড়কের উভয় পাশে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়।
প্রায় দুই ঘণ্টার অবরোধের একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। শ্রমিকদের একাংশ সড়কে আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ ও যানবাহন ভাঙচুর শুরু করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ টিয়ার গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করলে শ্রমিকদের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষের সৃষ্টি হয়। এ সময় শ্রমিকদের ছোড়া ইটপাটকেলে পুলিশ সদস্যরা আহত হন বলে জানা গেছে।
নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও অপারেশন) তারেক আল মেহেদী সংঘর্ষে ৯ পুলিশ সদস্য আহত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, আহতদের মধ্যে জেলা পুলিশের তিনজন এবং শিল্প পুলিশের ছয়জন সদস্য রয়েছেন।
সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিবি) হাসিনুজ্জামান জানান, বর্তমানে শ্রমিকেরা সড়ক ছেড়ে চলে গেছেন। যান চলাচলও স্বাভাবিক হয়েছে।
এদিকে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকায় বিপুলসংখ্যক পুলিশ এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা জলকামান ও সাঁজোয়া যান (এপিসি) নিয়ে অবস্থান করছেন। নতুন করে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, একই দাবিতে গত সোমবারও ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড অবরোধ করেছিলেন পোশাকশ্রমিকেরা। দুপুর থেকে প্রায় চার ঘণ্টা সড়কটিতে যান চলাচল বন্ধ থাকে। পরে বিকেল সোয়া ৪টার দিকে স্থানীয় সংসদ সদস্য, জেলা প্রশাসন ও পুলিশের আশ্বাসে শ্রমিকেরা অবরোধ প্রত্যাহার করেন।
সেদিন শ্রমিকদের পক্ষ থেকে পাঁচ দফা দাবি তুলে ধরা হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ, সব পোশাক কারখানায় রেশনিং ব্যবস্থা চালু, ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার নিশ্চিত করা, শ্রমিক আমজাদ হোসেন কামালসহ নিহত শ্রমিকদের হত্যার বিচার এবং বিনা কারণে শ্রমিক ছাঁটাই বন্ধসহ শ্রম আইন পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন।
Leave a Reply