নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি:
নারায়ণগঞ্জে সাম্প্রতিক শ্রমিক অসন্তোষের পেছনে আওয়ামী লীগের ইন্ধন রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা অ্যাডভোকেট আব্দুল্লাহ আল আমিন। ভবিষ্যতে শ্রমিক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে আবারও অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করে তিনি ব্যবসায়িক সংগঠনগুলোর নেতৃত্ব থেকে আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সরিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
রোববার (৮ নভেম্বর) নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠিত মাসিক আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
সভায় সাম্প্রতিক পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনের প্রসঙ্গ তুলে আব্দুল্লাহ আল আমিন বলেন, শ্রমিকদের সঙ্গে যোগাযোগের ভিত্তিতে দুই মাস আগেই তিনি এ ধরনের আন্দোলনের আশঙ্কার কথা ব্যবসায়ী নেতাদের জানিয়েছিলেন। তাঁর দাবি, আন্দোলনের পেছনে আওয়ামী লীগের সমর্থন ও ইন্ধন থাকতে পারে বলে তিনি তখন সতর্ক করেছিলেন। একই সঙ্গে ব্যবসায়িক ফোরামগুলোর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিলেন।
তিনি বলেন, ব্যবসায়িক সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদে আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দায়িত্বে থাকলে শ্রমিক আন্দোলনের মতো পরিস্থিতিতে তাঁদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। এ কারণে ব্যবসায়িক সংগঠনগুলোর নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক অবস্থান পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। প্রয়োজনে প্রশাসক নিয়োগের বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সাবেক সংসদ সদস্য সেলিম ওসমানের প্রসঙ্গ টেনে এনসিপির এই নেতা বলেন, আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা শিল্পকারখানা ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থাকলে তাঁদের রাজনৈতিক প্রভাব মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। ভবিষ্যতে একই ধরনের পরিস্থিতি যেন পুনরায় তৈরি না হয়, সে জন্য রাজনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে সম্মিলিত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
তবে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি ও অধিকারকে উপেক্ষা করে শুধু রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলা করা যাবে না বলেও সতর্ক করেন সংসদ সদস্য। তাঁর মতে, শ্রমিকদের দাবি আদায়ের বিষয়টি স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ। তাই একদিকে মালিকপক্ষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, অন্যদিকে শ্রমিকদের মর্যাদা ও ন্যায্য অধিকারও সুরক্ষিত রাখতে হবে। রাজনৈতিক ইস্যু ও শ্রমিকদের প্রকৃত দাবিকে পৃথকভাবে বিবেচনা করে পরিস্থিতি মোকাবিলার আহ্বান জানান তিনি।
সভায় তাবলিগ জামাতের সাদপন্থী ও জুবায়েরপন্থীদের মধ্যে সম্ভাব্য বিরোধ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন আব্দুল্লাহ আল আমিন। তিনি বলেন, ধর্মীয় বিষয় অত্যন্ত সংবেদনশীল। নারায়ণগঞ্জে তাবলিগ জামাতের বড় মারকাজ এবং নতুন করে সাদপন্থীদের মসজিদ প্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের উত্তেজনা তৈরি হওয়ার আগেই উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
এ বিষয়ে আলেম সমাজসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে নিয়ে আলোচনায় বসার পরামর্শ দেন তিনি। একই সঙ্গে জুলাই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভের নিরাপত্তা ও আশপাশের এলাকার পরিবর্তিত পরিস্থিতির বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার আহ্বান জানান। তাঁর মতে, ধর্মীয় সম্প্রীতি ও স্মৃতিস্তম্ভের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আগাম সমন্বিত উদ্যোগ নিলে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব।
জেলার মাদক পরিস্থিতি নিয়েও কঠোর অবস্থানের কথা জানান নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের এই সংসদ সদস্য। রূপগঞ্জে দায়িত্ব পালনকালে এক পুলিশ কর্মকর্তার ওপর হামলা এবং তাঁর হাত-পা ভেঙে দেওয়ার ঘটনার প্রসঙ্গ তুলে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। মাদকসংশ্লিষ্ট অপরাধীদের এমন দুঃসাহসিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কার্যকর আইনগত ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
আব্দুল্লাহ আল আমিন বলেন, শুধু মাদকসেবীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালালেই হবে না; মাদক সরবরাহকারী, বিক্রেতা, আমদানিকারক এবং বিভিন্ন মাদক স্পট পরিচালনাকারীদেরও চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে মাদকের স্পটগুলোতে সমন্বিত অভিযান পরিচালনার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
এদিকে ফতুল্লা স্টেডিয়াম এলাকার ওভারব্রিজ নির্মাণ ও সংস্কার-সংক্রান্ত দীর্ঘসূত্রতা নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেন সংসদ সদস্য। এ বিষয়ে সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে দ্রুত দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি বলেন, ফতুল্লা স্টেডিয়াম এলাকার ওভারব্রিজকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে একাধিক দুর্ঘটনা ঘটেছে এবং স্থানীয়দের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সড়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীও সরেজমিনে এসে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। এখন এলাকাবাসী সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কার্যকর উদ্যোগ দেখতে চান। সেখানে আবার কোনো দুর্ঘটনা বা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হলে পুরো নারায়ণগঞ্জের যান চলাচল ও জনজীবন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে জেলার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে রাজনৈতিক দল, প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান আব্দুল্লাহ আল আমিন। তিনি বলেন, কোনো ধরনের ষড়যন্ত্র বা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির অপচেষ্টায় তাঁরা অংশ নিতে চান না। একই সঙ্গে নির্বাচিত সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের বিরোধিতা করলেও নিয়মতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রতি তাঁর সমর্থন থাকবে। তবে আওয়ামী লীগ যদি কোনো অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করে, সে ক্ষেত্রে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
সভায় শ্রমিক অসন্তোষ, রাজনৈতিক পরিস্থিতি, ধর্মীয় সম্প্রীতি, মাদক নিয়ন্ত্রণ, পুলিশ সদস্যদের নিরাপত্তা এবং নগরীর গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগত সমস্যা নিয়ে আলোচনা হয়। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত ও দায়িত্বশীল ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করেন সংসদ সদস্য।
Leave a Reply