নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে লক্ষ্মী নারায়ণ কটন মিলস্ সার্বজনীন দুর্গা মন্দিরের জমি এক যুগেরও বেশি সময় ধরে দখলে রাখার অভিযোগ উঠেছে পোশাকশিল্প প্রতিষ্ঠান নীট কনসার্ন গ্রুপের বিরুদ্ধে। মন্দিরের জমি দখল, সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ ও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রবেশে বাধা দেওয়ার অভিযোগে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মন্দির কমিটির নেতারা। দীর্ঘদিনেও বিরোধের স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় এবার শারদীয় দুর্গোৎসবের প্রতিমা বিসর্জন না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তাঁরা।
মন্দির কমিটির নেতাদের দাবি, নীট কনসার্ন গ্রুপের নিয়ন্ত্রণের কারণে শতবর্ষী এই মন্দিরে সারা বছর স্বাভাবিক পূজা-অর্চনা করা সম্ভব হচ্ছে না। দুর্গাপূজার সময় সাময়িকভাবে মন্দিরের ফটক খুলে দেওয়া হলেও উৎসব শেষে আবারও তা বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে ধর্মীয় উপাসনালয়ে নিয়মিত প্রবেশাধিকার থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীরা।
মন্দির কমিটির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট তরুণ লাল বেগী জানান, প্রতিমা বিসর্জন না দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা গত ৪ অক্টোবর লিখিতভাবে নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারকে জানানো হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ জানিয়ে আসার পরও কার্যকর সমাধান না পাওয়ায় এবার তাঁরা প্রতিবাদের কঠোর অবস্থান নিয়েছেন
লক্ষ্মী নারায়ণ কটন মিলস্ সার্বজনীন দুর্গাপূজা উদ্যাপন কমিটির সভাপতি মিন্টু চন্দ্র দাস বলেন, শতবর্ষী এই মন্দিরে এবার ৮৪তম দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়েছে। অথচ নীট কনসার্ন গ্রুপের বিরুদ্ধে জমি দখলে রাখার অভিযোগের কারণে মন্দিরে নিয়মিত ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনা করা যাচ্ছে না।
তিনি বলেন, “শুধু দুর্গাপূজার সময় এক সপ্তাহের জন্য মন্দিরের গেট খুলে দেওয়া হয়। বিসর্জনের পর আর সেখানে পূজা-অর্চনা করতে পারি না। একটি নিবন্ধিত মন্দিরে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা নিয়মিত প্রবেশ করতে পারবেন না—এটা অত্যন্ত দুঃখজনক।”
মন্দির কমিটির পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারকে দেওয়া লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, নীট কনসার্ন গ্রুপ মন্দির, পুকুর ও মাঠের জমি দখলের চেষ্টা করছে। মন্দিরের চারপাশে সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রবেশে বাধা দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ তাঁদের।
অভিযোগপত্রে আরও দাবি করা হয়েছে, ২০২৩ সালের ১৭ জুন মন্দিরে ভাঙচুর চালানো হয়। এ ঘটনায় নীট কনসার্ন গ্রুপের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায়ী করেছেন মন্দির কমিটির নেতারা। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বী ও লক্ষ্মী নারায়ণ কটন মিলসের শেয়ারহোল্ডারদের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭২ সালে কারখানাটি রাষ্ট্রায়ত্ত করা হয়। দীর্ঘদিন লোকসানের পর ২০০০ সালে সরকার কারখানাটির মালিকানা ৫১০ জন শ্রমিক ও কর্মচারীর মধ্যে হস্তান্তর করে। পরে ২০১২ সালে নীট কনসার্ন গ্রুপ বিনিয়োগকারী হিসেবে কারখানাটির পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত হয়।
মন্দির কমিটির দাবি, মালিকানা হস্তান্তরের সময় মন্দির, মসজিদ, পুকুর ও মাঠের জমি সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছিল। কিন্তু এসব জমির সীমানা ও দখল নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে জটিলতা চলছে। তাঁদের অভিযোগ, নীট কনসার্ন গ্রুপের কারণে মন্দিরের জমির স্বাভাবিক ব্যবহার ও ধর্মীয় কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
অ্যাডভোকেট তরুণ লাল বেগী বলেন, “আমরা চাই, মন্দিরের জমি সঠিকভাবে পরিমাপ করে আমাদের বুঝিয়ে দেওয়া হোক। বছরের পর বছর ধরে এ দাবি জানালেও সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। বারবার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, কিন্তু বাস্তবে আমরা কোনো স্থায়ী সমাধান পাইনি।”
মিন্টু চন্দ্র দাস জানান, গত বছরও জমি বিরোধের প্রতিবাদে প্রতিমা বিসর্জন না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তাঁরা। কিন্তু প্রশাসনের আশ্বাসে শেষ মুহূর্তে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন। এবারও একইভাবে আশ্বাস দিয়ে তাঁদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের চেষ্টা করা হলে তা মেনে নেওয়া হবে না বলে জানিয়েছেন তিনি।
তাঁর ভাষ্য, বিষয়টি বাংলাদেশ সনাতন পার্টির পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়েও অবহিত করা হয়েছে। তাঁদের দাবি, শুধু আশ্বাস নয়, মন্দিরের জমি উদ্ধার ও নিয়মিত পূজা-অর্চনার পরিবেশ নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
সোমবার মন্দিরের পূজার আয়োজন পরিদর্শনে যান নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক অধ্যাপক মামুন মাহমুদ। এ সময় বাংলাদেশ সনাতন পার্টির জেলা কমিটির সভাপতি টনি মল্লিক তাঁকে প্রতিমা বিসর্জন না দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানান।
টনি মল্লিক বলেন, “আমাদের মন্দিরটি সব সময় তালাবদ্ধ থাকে। সনাতনীরা সেখানে নিয়মিত পূজা দিতে পারেন না। তাই এবার প্রতিমা বিসর্জন না দিয়ে মন্দিরেই রাখা হবে। মন্দিরের ভেতরে নিত্যপূজাও চলবে।”
মন্দিরের জমি নিয়ে বিরোধের বিষয়টি জানার পর মঙ্গলবার বিকেলে সেখানে যান সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এসএম ফয়েজ উদ্দিন। এ সময় মন্দির কমিটির নেতারা ও স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীরা তাঁকে তাঁদের অভিযোগ এবং প্রতিমা বিসর্জন না দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানান।
ইউএনও এসএম ফয়েজ উদ্দিন বলেন, পূজা কার্যক্রমে প্রতিবন্ধকতার অভিযোগ তুলে তাঁরা এবার প্রতিমা বিসর্জন করবেন না বলে জানিয়েছেন। গত বছরও তাঁরা একই সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছিলেন। পরে প্রশাসনের আশ্বাসে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন।
তিনি আরও বলেন, বিষয়টি সমাধানে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। আগামী ২৬ অক্টোবর মন্দিরের জমি নিয়ে বৈঠকে বসার কথাও তাঁদের জানানো হয়েছে। প্রশাসন বিরোধ নিষ্পত্তির চেষ্টা করছে।
তবে মঙ্গলবার রাত আটটার দিকেও মন্দির কমিটির নেতারা তাঁদের অবস্থানে অনড় থাকার কথা জানান। তাঁদের বক্তব্য, এবার আর আশ্বাসের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করবেন না; জমি বিরোধের স্থায়ী সমাধান চান তাঁরা।
মন্দিরের জমি দখল, প্রবেশে বাধা ও ভাঙচুরের অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে নীট কনসার্ন গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) জয়নাল আবেদীন মোল্লার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। অভিযোগের বিষয়ে জানতে চেয়ে খুদেবার্তাও পাঠানো হয়। তবে প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তিনি কোনো সাড়া দেননি।
মন্দির কমিটির অভিযোগের বিষয়ে নীট কনসার্ন গ্রুপের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।
Leave a Reply