বৃহস্পতিবার, ৭ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৪শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ,
শিরোনামঃ
বন্দরে কুড়িপাড়া খাল পুনঃখনন কাজের উদ্বোধন করলেন এমপি কালাম  নারায়ণগঞ্জে মাদক ও সন্ত্রাসীদের অপরাধ দমনে র‌্যাবে’র কঠোর বার্তা শীতলক্ষ্যা নদী থেকে অজ্ঞাত এক পুরুষের মরদেহ উদ্ধার বন্দরে এক হোসিয়ারি কর্মীর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার  রূপগঞ্জে মাদক বিরোধী অভিযান ৩২০০ পিস ইয়াবাসহ ২ জন গ্রেপ্তার  সিদ্ধিরগঞ্জে মাদক কারবারি ও বিভিন্ন মামলার পলাতক আসামিসহ ৯ জন গ্রেপ্তার  খানপুর ৩ শ শয্যা হাসপাতাল ৫০০শয্যা হচ্ছে চলতি বছরেই : ডাক. আবুল বাসার নারায়ণগঞ্জে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে: এমপি কালাম সিদ্ধিরগঞ্জে ডিবি পুলিশ পরিচয়ে মালয়েশিয়া প্রবাসীর থেকে স্বর্ণালংকার লুট মন্দিরভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম’ প্রকল্পের মনিটরিং ও মতবিনিময় সভা

ফ্যাক্টরির যন্ত্রপাতি বিক্রি করে শ্রমিকের বকেয়া বেতন পরিশোধ করে ইতিহাস গড়লেন মানবিক ডিসি জাহিদুল ইসলাম

নিউজ ২৪ নারায়ণগঞ্জঃ

এস এম জহিরুল ইসলাম বিদ্যুৎ :

চট্টগ্রাম নগরীর বায়েজিদ এলাকায় অবস্থিত জে পি সনেট লিমিটেড নামের একটি পোশাক কারখানাকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হওয়া শ্রমিক অসন্তোষ,অনিশ্চয়তা এবং মানবিক সংকটের অবসান ঘটেছে অবশেষে চট্টগ্রামের মানবিক জেলা প্রশাসকের সরাসরি হস্তক্ষেপে।প্রায় তিন মাস ধরে বেতন না পেয়ে মানবেতর জীবনযাপন করা ১৩০ জন শ্রমিকের হাতে অবশেষে তাদের প্রাপ্য অর্থ তুলে দেন।

এই ঘটনাটি শুধু একটি শ্রমিক বেতন পরিশোধের ঘটনা নয় বরং এটি বাংলাদেশের শ্রমখাতের বাস্তবতা, মালিকপক্ষের আর্থিক সংকট,প্রশাসনিক ভূমিকা এবং মানবিক দায়িত্ববোধের একটি বড় উদাহরণ হয়ে উঠেছে।

কারখানাটিতে কর্মরত শ্রমিকরা নিয়মিত কাজ করলেও গত তিন মাস ধরে তারা কোনো বেতন পাননি। শুরুতে শ্রমিকরা বিষয়টি স্বাভাবিকভাবে নিয়েছিলেন এবং মালিকপক্ষের কাছে ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করেছিলেন।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়। বেতন না পেয়ে অনেক শ্রমিক ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন, কারও পরিবারে খাবারের সংকট দেখা দেয়, কেউ আবার সন্তানের পড়াশোনা চালাতে ব্যর্থ হন।

একপর্যায়ে বকেয়া টাকার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১৬ লাখ টাকা।এই অর্থের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল ১৩০টি পরিবারের বেঁচে থাকার সংগ্রাম।

গত ১৪ মার্চ শ্রমিকরা তাদের দাবি আদায়ের জন্য কারখানার ভেতরে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন।

নারী শ্রমিকসহ সবাই কারখানার ভেতরেই অবস্থান নিতে থাকেন।কেউ কেউ সেখানেই রাত কাটান। তাদের দাবি ছিল একটাই বকেয়া বেতন পরিশোধ করতে হবে।

দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। শ্রমিকদের মধ্যে ক্ষোভ চরমে পৌঁছায় এবং যে কোনো সময় সংঘর্ষ বা ভাঙচুরের আশঙ্কা দেখা দেয়।

পরিস্থিতি অবনতির দিকে গেলে দ্রুত পদক্ষেপ নেয় চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম এর নির্দেশে একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে কারখানায় সার্বক্ষণিকভাবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে মালিকপক্ষ, শ্রমিক প্রতিনিধি, শিল্প পুলিশ এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সঙ্গে একাধিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

এই বৈঠকে মালিকপক্ষ প্রথমে নানা অজুহাত দেখালেও পরে সারাদেশে মানবিক ডিসি হিসেবে পরিচিত মোঃ জাহিদুল ইসলাম মিয়ার কঠোর মানবিক নির্দেশনায় যন্ত্রপাতি বিক্রি করে বকেয়া পরিশোধের লিখিত অঙ্গীকার করে।

তবে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।এতে করে শ্রমিকদের মধ্যে আবারও হতাশা ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।

নারী শ্রমিকরা কান্নায় ভেঙে পড়েন, অনেকেই বলেন ঈদের আগে তারা যদি বেতন না পান তবে তাদের পরিবার না খেয়ে থাকবে।

এই অবস্থায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।

এই সংকটময় মুহূর্তে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা সরাসরি হস্তক্ষেপ করেন।

তিনি স্পষ্ট নির্দেশ দেন শ্রমিকদের বেতন যেকোনো উপায়ে নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে যন্ত্রপাতি বিক্রি করার মতো কঠোর সিদ্ধান্তও নিতে হবে।

এই নির্দেশনার পর প্রশাসন দ্রুত পদক্ষেপ নেয় এবং কারখানার যন্ত্রপাতি ও স্টক বিক্রির প্রক্রিয়া শুরু হয়।

প্রথমে সম্ভাব্য ক্রেতারা গড়িমসি করছিলেন কিন্তু প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের কারণে তারা শেষ পর্যন্ত রাজি হন।রাতভর আলোচনা চলে। উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে রাত ১২টার দিকে একটি সমঝোতায় পৌঁছানো হয়।এরপর ভোর ৬টার মধ্যে যন্ত্রপাতি বিক্রি করে প্রায় ১৬ লাখ টাকা সংগ্রহ করা হয় এবং তা শ্রমিকদের মধ্যে বিতরণ করা হয়।

তিন মাসের অপেক্ষার পর বেতন হাতে পেয়ে শ্রমিকদের মধ্যে স্বস্তি ফিরে আসে।অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। কেউ কেউ বলেন এটি তাদের জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময় ছিল।শ্রমিক মো. মনির হোসেন বলেন প্রশাসনের হস্তক্ষেপ না হলে তারা হয়তো ঈদের আগে বেতন পেতেন না।এইরকম শ্রমিক-বান্ধব জেলা প্রশাসক শ্রমিকরা আনন্দিত, উচ্ছ্বাসিত ও তার কাছে চির কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন কর্মরত সমস্ত শ্রমিকরা।

নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট প্লাবন কুমার বিশ্বাস জানান প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা না থাকায় বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন প্রশাসনের সার্বক্ষণিক নজরদারি এবং দৃঢ় অবস্থানের কারণেই দ্রুত সমাধান সম্ভব হয়েছে।

কারখানার প্রতিনিধি সজীব দাস বলেন তারা বিভিন্নভাবে অর্থ জোগাড়ের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন।

শেষ পর্যন্ত যন্ত্রপাতি বিক্রি করেই শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধ করতে হয়েছে।

বাংলাদেশের পোশাক শিল্প দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। কিন্তু এই খাতে শ্রমিকদের বেতন বকেয়া থাকার ঘটনা নতুন নয়।

এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করল যে যথাযথ তদারকি এবং দ্রুত প্রশাসনিক পদক্ষেপ থাকলে সংকটের সমাধান সম্ভব।

অনেক স্থানীয় বাসিন্দা এই ঘটনাকে মানবিক প্রশাসনের একটি উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে দেখছেন।

তাদের মতে এমন সাহসী এবং মানবিক সিদ্ধান্ত খুবই বিরল।

এই ঘটনাটি শুধু একটি কারখানার সংকট সমাধান নয় বরং এটি একটি বার্তা শ্রমিকদের অধিকার উপেক্ষা করলে তা একসময় বড় সংকটে রূপ নেয়।

আর সময়মতো সঠিক সিদ্ধান্ত নিলে শুধু একটি সমস্যা নয় বরং শতাধিক পরিবারের জীবনেও স্বস্তি ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

খবরটি সবার সাথে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ বিভাগের আরও খবর...।