আসন্ন শারদীয় দুর্গাপূজা-২০২৬ সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ, সুশৃঙ্খল ও উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপনের লক্ষ্যে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে প্রস্তুতিমূলক সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় জেলার ২৪০টি পূজামণ্ডপে সার্বিক নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, যানবাহন ব্যবস্থাপনা, বিসর্জন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব প্রতিরোধসহ নানা বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) সকালে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত সভায় সভাপতিত্ব করেন নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির।
সভায় জেলা প্রশাসক বলেন, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপন নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসন বদ্ধপরিকর। সরকারের পক্ষ থেকে বরাদ্দকৃত অনুদান জেলার সব পূজামণ্ডপে যথাযথভাবে পৌঁছানো নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
তিনি জানান, এ বছর নারায়ণগঞ্জ জেলায় পূজামণ্ডপের সংখ্যা বেড়ে ২৪০টিতে দাঁড়িয়েছে। প্রতিমা নির্মাণ থেকে শুরু করে পূজা উদযাপন ও প্রতিমা বিসর্জন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সতর্কতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হবে।
সামাজিক ও ধর্মীয় সম্প্রীতি অটুট রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, আজান ও নামাজের সময় প্রয়োজনীয় নীরবতা বজায় রেখে নারায়ণগঞ্জের দীর্ঘদিনের সম্প্রীতির ঐতিহ্য ধরে রাখতে হবে। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালনের ক্ষেত্রে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহনশীলতা বজায় রাখার আহ্বান জানান তিনি।
সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. হাবিবুর রহমান, পিপিএম-সেবা বলেন, নারায়ণগঞ্জ দীর্ঘদিন ধরে ধর্মীয় সম্প্রীতির জেলা হিসেবে পরিচিত। এখানে সব ধর্মের মানুষ পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির সঙ্গে বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব পালন করে আসছেন।
তিনি বলেন, “ধর্ম যার যার, উৎসব সবার”—এই মূলমন্ত্রকে ধারণ করে নারায়ণগঞ্জে শারদীয় দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণভাবে উদযাপনে জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
পুলিশ সুপার বলেন, প্রতিমা তৈরির শুরু থেকেই জেলা পুলিশ নিরাপত্তা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। পূজামণ্ডপগুলোতে পুলিশ ও আনসার সদস্য মোতায়েনের পাশাপাশি সাদা পোশাকে গোয়েন্দা নজরদারি, সিসিটিভি মনিটরিং এবং মোবাইল টিম সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করবে।
বিশেষ করে প্রতিমা বিসর্জনের দিন সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, যেকোনো ধরনের অপতৎপরতা কঠোরভাবে দমন করা হবে। পূজা চলাকালীন সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের পক্ষ থেকে মনিটরিং সেল গঠন করা হবে।
পুলিশ সুপার মো. হাবিবুর রহমান আশা প্রকাশ করেন, কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ, সুশৃঙ্খল ও উৎসবমুখর পরিবেশে আসন্ন শারদীয় দুর্গাপূজা উদযাপিত হবে।
তিনি আরও বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুরোনো বা এডিট করা ভিডিও ব্যবহার করে কেউ গুজব কিংবা সাম্প্রদায়িক উসকানি ছড়ানোর চেষ্টা করলে তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি যাচাই করা হবে এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সভায় পূজাকে কেন্দ্র করে গুজব ও সাম্প্রদায়িক উসকানি প্রতিরোধে সাইবার মনিটরিং সেল সক্রিয় রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। প্রতিটি পূজামণ্ডপে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং সাদা পোশাকে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদারের সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া মণ্ডপগুলোতে নারী ও পুরুষের জন্য পৃথক প্রবেশ ও বের হওয়ার ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা এবং অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ফায়ার সার্ভিসের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়।
পূজামণ্ডপে যাতায়াতের রাস্তা সংস্কার, আলোকসজ্জা এবং বিশুদ্ধ পানীয় জলের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সিটি করপোরেশন ও সংশ্লিষ্ট পৌরসভাকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে।
প্রতিমা বিসর্জনের জন্য নির্ধারিত ঘাটগুলো সংস্কারের পাশাপাশি বিসর্জনের সময় নৌ-পুলিশ, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) এবং ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দলকে প্রস্তুত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় সিভিল সার্জন কার্যালয়ের পক্ষ থেকে অ্যাম্বুলেন্স প্রস্তুত রাখার কথাও জানানো হয়।
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য রক্ষায় শাস্ত্রীয় রীতি অনুসরণ করে প্রতিমা নির্মাণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কোনো ধর্ম, ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে কটাক্ষ করে এমন বিকৃত রূপ কিংবা অসুরের মুখে দাড়ি সংযোজন না করার বিষয়ে সভায় নির্দেশনা দেওয়া হয়।
সরকার নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিমা বিসর্জন সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিসর্জনের সময় নিরাপদ নৌ চলাচল নিশ্চিত করতে ৫ নম্বর ঘাট থেকে ভারী নৌযান সরিয়ে রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
দশমীর দিন নারায়ণগঞ্জ শহরে ভারী যানবাহন প্রবেশে নিয়ন্ত্রণ আরোপ এবং নামাজের সময় উচ্চস্বরে মাইক, গান-বাজনা না বাজানোর বিষয়েও সভায় নির্দেশনা দেওয়া হয়।
সভায় অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) নাইমা ইসলাম, জেলা প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারা, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সচিব, বিজিবি ও র্যাবের সহ-অধিনায়ক, জেলা আনসার কমান্ডার, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের পূজা উদযাপন কমিটির নেতৃবৃন্দ এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
Leave a Reply