নিউজ ২৪ নারায়ণগঞ্জঃ
ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখতে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন। সারা বাংলাদেশে মানবিক জেলা প্রশাসক হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার উদ্যোগে দেশে প্রথমবারের মতো ঈদ উপলক্ষে বিভিন্ন নিত্যপণ্যে মূল্যছাড় ঘোষণা করেছেন ব্যবসায়ীরা।
শনিবার ২৩ মে সকালে নগরের অন্যতম বৃহৎ খুচরা বাজার রেয়াজউদ্দিন বাজারে ‘উৎসব ছাড়’ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। এ সময় তিনি বলেন, “উৎসবে কমবে দাম, বাড়বে আনন্দ — এই লক্ষ্য নিয়েই উদ্যোগটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।”
রেয়াজউদ্দিন বাজার বণিক কল্যাণ সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ ছালামত আলী ও সাধারণ সম্পাদক মো. আব্দুস শুক্কুরের স্বাক্ষরিত তালিকা অনুযায়ী, বিভিন্ন মসলা ও নিত্যপণ্যের দাম কমানো হয়েছে। এর মধ্যে এলাচির দাম কেজিতে ৪,৮০০ টাকা থেকে কমিয়ে ৪,২০০ টাকা, দারুচিনি ৬০০ টাকা থেকে ৫২০ টাকা এবং লবঙ্গ ১,৬০০ টাকা থেকে কমিয়ে ১,৩৫০ থেকে ১,৪০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। কিসমিসের দাম ৯৮০ টাকা থেকে ৭২০ টাকা, আদা ১৯০ টাকা থেকে ১৫০ টাকা এবং রসুন ১৪০ টাকা থেকে ১১০ টাকায় নামানো হয়েছে।
এছাড়া পেঁয়াজের মানভেদে কেজিতে ২৫ থেকে ৪০ টাকা পর্যন্ত কমানো হয়েছে। জিরার দাম ৭৫০ টাকা থেকে কমিয়ে ৫২০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। বাজার সূত্রে জানা গেছে, ভারতীয় জিরার দাম ৬৫০ টাকা থেকে কমিয়ে ৫৭০ টাকা, মিষ্টি জিরা ২৮০ টাকা থেকে ২২৫ টাকা এবং এলাচি ৪,৬০০ টাকা থেকে ৪,১০০ টাকা করা হয়েছে। লবঙ্গ, দারুচিনি, গোলমরিচ, জায়ফল, মরিচ, হলুদ ও ধনিয়াসহ বিভিন্ন পণ্যে ৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দেওয়া হচ্ছে।
উদ্বোধনী কার্যক্রম ও বাজার পরিদর্শনে উপস্থিত ছিলেন বাকলিয়া সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শিফাত বিনতে আরা, রেয়াজউদ্দিন বাজার সমিতির সভাপতি ছালামত আলী, সাধারণ সম্পাদক মো. কালামসহ জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা।
পরিদর্শনের সময় জেলা প্রশাসক বিভিন্ন দোকান ও আড়ত ঘুরে পণ্যের মজুত, আমদানি পরিস্থিতি এবং মূল্যতালিকা পর্যবেক্ষণ করেন। পেঁয়াজ, রসুন, আদা, মরিচ, হলুদ ও জিরাসহ বিভিন্ন মসলার আড়তে গিয়ে তিনি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং মূল্যছাড় কার্যক্রম বাস্তবায়নের অবস্থা খতিয়ে দেখেন।
জেলা প্রশাসনের সঙ্গে একাধিক বৈঠকের পর ব্যবসায়ী নেতারা ঈদ উপলক্ষে পণ্যের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখার বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছান। ব্যবসায়ীরা বলেন, সাধারণ মানুষের স্বস্তির কথা বিবেচনায় রেখে বিভিন্ন পণ্যে ছাড় দেওয়া হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ২০ শতাংশ পর্যন্ত মূল্য কমানো হয়েছে।
বাজার পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, “প্রতি বছর উৎসবকে কেন্দ্র করে বাজারে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়। সেই অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণে এনে সাধারণ মানুষের জন্য স্বস্তিদায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।”
তিনি বলেন, “উন্নত বিশ্বে উৎসব এলেই পণ্যের দাম কমে। কিন্তু আমাদের দেশে কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর মধ্যে অতিরিক্ত মুনাফার প্রবণতা দেখা যায়। এতে নিম্নবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য উৎসবের আনন্দ অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। আমরা চাই, সব শ্রেণির মানুষ যেন আনন্দের সঙ্গে উৎসব পালন করতে পারে।”
চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের প্রশংসা করে জেলা প্রশাসক বলেন, “খাতুনগঞ্জ ও রেয়াজউদ্দিন বাজারের ব্যবসায়ীরা প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করেছেন। আদা, পেঁয়াজ, রসুন, মরিচ ও গরম মসলাসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম ৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে জিরার দাম ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত কমেছে।”
তিনি আরও বলেন, “চট্টগ্রাম দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী। ব্যবসায়িক যেকোনো ইতিবাচক পরিবর্তনে এখানকার ব্যবসায়ীরাই নেতৃত্ব দেন। আজ তারা সারা দেশের জন্য একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।”
আদার বাজারে সাম্প্রতিক অস্থিরতার প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক জানান, বন্দরে আটকে থাকা ৪১টি কনটেইনার খালাসে বিলম্ব হওয়ায় বাজারে সংকট তৈরি হয়েছিল। পরে বন্দর কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় ৩৭টি কনটেইনার খালাস করা হয়েছে। বাকি কনটেইনারও দ্রুত খালাস করা হবে বলে তিনি জানান।
কালোবাজারির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথাও পুনর্ব্যক্ত করেন জেলা প্রশাসক। তিনি বলেন, “কেউ সিন্ডিকেট করে পার পাবে না। সাধারণ মানুষের আস্থা ও দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার কোনো সুযোগ দেওয়া হবে না।”
জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, ঈদ পর্যন্ত চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ, রেয়াজউদ্দিন বাজারসহ জেলার বিভিন্ন বাজারে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট ও ভ্রাম্যমাণ টিম অভিযান চালাবে। জেলা ও উপজেলার বাজারগুলোতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের নেতৃত্বে সার্বক্ষণিক নজরদারিও অব্যাহত থাকবে।
জেলা প্রশাসনের এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন স্থানীয় ক্রেতারা। রেয়াজউদ্দিন বাজার আড়তদার কল্যাণ সমিতির নেতারা জানিয়েছেন, বাজারে পণ্যের কোনো ঘাটতি নেই এবং যৌক্তিক লাভে ন্যায্যমূল্যে পণ্য বিক্রিতে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
Leave a Reply