নিউজ ২৪ নারায়ণগঞ্জ
সিদ্ধিরগঞ্জ প্রতিনিধি
নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে জাকির হোসেন ওরফে ‘কাইল্লা জাকির’-এর বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও ভূমিদস্যুতাসহ নানা অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। মিজমিজি, পাইনাদি ও নতুন মহল্লা এলাকায় প্রভাবশালী মহলের আশ্রয়ে একটি নিজস্ব বাহিনী গড়ে তুলে এসব কর্মকাণ্ড চালানোর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বাড়ি বা স্থাপনা নির্মাণ, জমি কেনাবেচা কিংবা জমিতে বালু ভরাট ও নির্মাণকাজ শুরু করতে গেলেই বিভিন্ন অজুহাতে চাঁদা দাবি করা হয়। দাবিকৃত টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে কাজ বন্ধ করে দেওয়া, ভয়ভীতি প্রদর্শন, মারধর ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কেউ প্রতিবাদ করলে কিংবা আইনের আশ্রয় নিলে তাকে নানা ধরনের হয়রানির মুখে পড়তে হয় বলেও দাবি স্থানীয়দের।
স্থানীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ অনুযায়ী, জাকিরের বিরুদ্ধে হত্যা, মাদক ও চাঁদাবাজিসহ একাধিক মামলা রয়েছে। এসব মামলার বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি একাধিকবার পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়ে কারাভোগ করেছেন বলেও জানা গেছে।
মিজমিজি বাতানপাড়া এলাকায় জমি কিনে ভবন নির্মাণ করতে গিয়ে চাঁদা দাবি ও নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছিলেন মো. মিজানুর রহমান নামে এক ব্যক্তি। স্থানীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তিনি ওই এলাকায় পাঁচ কাঠা জমি কেনার পর নির্মাণকাজ শুরু করতে গেলে কাইল্লা জাকির ও কোটিপতি মনির নামে পরিচিত এক ব্যক্তি বাধা দেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়, একপর্যায়ে মিজানুর রহমানকে তুলে নিয়ে ভয়ভীতি দেখানো ও শারীরিক নির্যাতন করা হয়। ওই জমিতে নির্মাণকাজ করতে হলে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দিতে হবে বলে দাবি করা হয়। টাকা না দিয়ে কাজ চালিয়ে গেলে প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগী। এ ঘটনায় তিনি থানায় অভিযোগ দায়ের করেছিলেন বলে জানা গেছে।
সর্বশেষ মিজমিজি এলাকার বাসিন্দা মোসা. সুফিয়া আলী কাইল্লা জাকির ও তার ছয় সহযোগীর বিরুদ্ধে জমি দখলের চেষ্টা এবং ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগে সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
অভিযোগে সুফিয়া আলী উল্লেখ করেন, তার বাবার কাছ থেকে ওয়ারিশ সূত্রে পাওয়া ১০ শতাংশ জমি জাকির দখলের চেষ্টা করছেন। এ উদ্দেশ্যে ওই জমিতে বালু ভরাট করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। এতে বাধা দিলে তাকে ভয়ভীতি ও হুমকি দেওয়া হয় এবং ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে সিদ্ধিরগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) হোসেন বলেন, “লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। অভিযোগটি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, কাইল্লা জাকির ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে বিচার-সালিশের নামে অসহায় মানুষের কাছ থেকে অর্থ আদায়, জমি দখলের চেষ্টা এবং বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ রয়েছে। দেশীয় অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে ছিনতাই ও এলাকায় সন্ত্রাসী মহড়া দেওয়ার অভিযোগও করেছেন কেউ কেউ।
তাদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে এসব কর্মকাণ্ড চলতে থাকায় এলাকার সাধারণ মানুষ অনেকটা জিম্মি হয়ে পড়েছেন। প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আশ্রয়-প্রশ্রয় থাকায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলতে অনেকেই ভয় পান। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য ও তদন্তের ফলাফল পাওয়া গেলে প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হবে।
এলাকাবাসীর দাবি, কাইল্লা জাকির সিদ্ধিরগঞ্জ থানা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক এম এ হালিম জুয়েলের ভাতিজা। রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে তিনি এলাকায় প্রভাব বিস্তার করছেন বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
তাদের আরও অভিযোগ, ৫ আগস্টের পর জাকিরের প্রভাব ও সম্পদ বাড়তে থাকে। কিছুদিন পরপর নতুন মোটরসাইকেলে চলাচল এবং একপর্যায়ে একটি ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার করতে দেখা গেছে বলেও দাবি করেন তারা। বর্তমানে নিজের নামে জমি কেনার উদ্যোগ নেওয়ার কথাও স্থানীয়দের কেউ কেউ জানিয়েছেন।
তবে রাজনৈতিক পরিচয়, সম্পদের উৎস কিংবা কারও আশ্রয়-প্রশ্রয়ে অপরাধ কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য পাওয়া যায়নি। এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত জাকির হোসেন, এম এ হালিম জুয়েল ও সংশ্লিষ্ট অন্য ব্যক্তিদের বক্তব্যও পাওয়া প্রয়োজন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, মিজমিজি, পাইনাদি ও নতুন মহল্লা এলাকায় চাঁদাবাজি, জমি দখল, মাদক ব্যবসা এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি অভিযোগকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কেউ যাতে রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী পরিচয় ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করতে না পারে, সে বিষয়েও প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ চান তারা।
এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটিত হবে এবং অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এতে সিদ্ধিরগঞ্জের সাধারণ মানুষের মধ্যে বিরাজমান আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা দূর হবে বলে মনে করছেন তারা।
Leave a Reply