
স্থানীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে নারায়ণগঞ্জ বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিরোধ, নেতৃত্বের সমন্বয়হীনতা ও সাংগঠনিক পুনর্গঠন নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। আদালতপাড়ায় বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের দুই পক্ষের মধ্যে হাতাহাতি, মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ, দুই নেতাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ এবং জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের এক নেতার পদত্যাগ—সাম্প্রতিক এসব ঘটনায় দলটির অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে।
শুধু মূল দল নয়, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর মধ্যেও নেতৃত্বের কর্তৃত্ব, ইউনিট কমিটি গঠন, নতুন কমিটি ঘোষণায় বিলম্ব এবং ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন নিয়ে অসন্তোষের কথা শোনা যাচ্ছে। বিশেষ করে জেলা ও মহানগর ছাত্রদলের নতুন কমিটি না হওয়া এবং মহানগর যুবদলের অভ্যন্তরীণ বিরোধ সংগঠনগুলোর সাংগঠনিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের আগে দলীয় ঐক্য, নেতৃত্বের সমন্বয় এবং তৃণমূলের সক্রিয়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এমন সময়ে অভ্যন্তরীণ বিরোধ দীর্ঘায়িত হলে তার প্রভাব সাংগঠনিক কার্যক্রম ও নির্বাচনী প্রস্তুতিতেও পড়তে পারে। তবে এসব বিরোধ কতটা বিস্তৃত এবং নির্বাচনী রাজনীতিতে এর প্রভাব কী হবে, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট নেতৃত্বের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর।
গত মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির ভবনে বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের দুই পক্ষের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এ সময় নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ ওঠে। ঘটনায় পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ জাকির, অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট ওমর ফারুক নয়নসহ কয়েকজন আহত হন বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, আইনজীবী সমিতির নির্বাচন, সাংগঠনিক নেতৃত্ব এবং বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালনকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের মতবিরোধ থেকে এ ঘটনার সূত্রপাত। তবে সংঘাতের জন্য উভয় পক্ষই পরস্পরকে দায়ী করেছে।
আদালতপাড়ার এই ঘটনা বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের মধ্যকার বিরোধকে প্রকাশ্যে নিয়ে আসে। একই সঙ্গে দল-সমর্থিত পেশাজীবী সংগঠনগুলোর অভ্যন্তরীণ সমন্বয় ও বিরোধ নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন সামনে আসে।
আদালতপাড়ার ঘটনার পর বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির দুই নেতাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ার বিষয়টি সামনে আসে। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে নেওয়া এ পদক্ষেপকে ঘিরেও নেতাকর্মীদের মধ্যে আলোচনা চলছে।
একই দিন জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের নারায়ণগঞ্জ জেলা শাখার যুগ্ম আহ্বায়কের পদ থেকে পদত্যাগ করেন অ্যাডভোকেট সামছুন নূর বাঁধন। তাঁর পদত্যাগপত্রে সংগঠনের অভ্যন্তরীণ কোন্দল, দীর্ঘদিন সম্মেলন না হওয়া এবং সাংগঠনিক অস্থিরতার বিষয়গুলো উঠে এসেছে।
বাঁধনের অভিযোগ, ২০২৫ সালের ২৭ মার্চ কমিটি গঠনের পর সম্মেলনের প্রস্তুতি নেওয়া হলেও কেন্দ্রীয়ভাবে সম্মেলনের তারিখ নির্ধারণ করা হয়নি। পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ বিরোধ ও উপদলীয় কর্মকাণ্ডের কারণে সংগঠনের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
পরপর এসব ঘটনা দল-সমর্থিত আইনজীবী সংগঠনগুলোর সাংগঠনিক স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে। তবে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য ও বিরোধ নিষ্পত্তিতে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অবস্থান এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
নারায়ণগঞ্জ বিএনপির অঙ্গসংগঠনগুলোর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি জেলা ও মহানগর ছাত্রদলের নতুন কমিটি গঠন। কমিটি না থাকায় সাংগঠনিক কার্যক্রম, নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা এবং নতুন নেতৃত্ব তৈরির প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ সংগঠনটির একাংশের।
২০২৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সিদ্ধান্তে নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর ছাত্রদলের কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। একই সঙ্গে এ দুই ইউনিটের অধীন উপজেলা, থানা, পৌরসভা, কলেজ, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ের কমিটিও বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছিল।
এর আগে ২০২৩ সালের ২৬ জানুয়ারি নাহিদ হাসান ভূঁইয়াকে সভাপতি ও জুবায়ের রহমান জিকুকে সাধারণ সম্পাদক করে জেলা ছাত্রদলের নয় সদস্যের আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়। একই দিনে রাকিবুর রহমান সাগরকে সভাপতি ও রাহিদ ইসতিয়াক সিকদারকে সাধারণ সম্পাদক করে মহানগর ছাত্রদলের ছয় সদস্যের আংশিক কমিটি দেওয়া হয়েছিল। পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের আগেই ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে কমিটি দুটি বিলুপ্ত হয়।
এরপর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও নতুন নেতৃত্ব ঘোষণা না হওয়ায় পদপ্রত্যাশীদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে বলে দাবি নেতাকর্মীদের একাংশের। তাঁদের মতে, দীর্ঘদিন কমিটি না থাকলে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা, কর্মীদের মূল্যায়ন এবং নতুন প্রজন্মকে সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হয়।
রাজপথে সক্রিয় নেতাকর্মীদের সাংগঠনিক দায়িত্বে আনা এবং তৃণমূল পর্যায়ে কার্যকর নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার দাবি উঠলেও নতুন কমিটি গঠনের বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় অসন্তোষ রয়ে গেছে।
ছাত্রদলের মতো মহানগর যুবদলেও নেতৃত্বের অবস্থান, পৃথক কর্মসূচি পালন এবং তৃণমূলের কমিটি গঠন নিয়ে বিরোধ প্রকাশ্যে এসেছে।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর মহানগর যুবদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য সহিদুল ইসলাম পৃথকভাবে দলীয় কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেন। পরদিন ১ অক্টোবর চিটাগাংরোড এলাকায় অনুসারীদের নিয়ে পৃথক শোডাউন করেন তিনি। এর আগে সংগঠনটির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সাগর প্রধানও পৃথক কর্মসূচি পালন করে আলোচনায় আসেন।
২০২৩ সালের ২৯ আগস্ট মনিরুল ইসলাম সজলকে আহ্বায়ক, সাগর প্রধানকে সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক এবং সাহেদ আহমেদকে সদস্যসচিব করে মহানগর যুবদলের আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়। পরবর্তী সময়ে ২০২৫ সালের ১৫ জানুয়ারি ৫১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হলেও ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন পর্যায়ে সাংগঠনিক পুনর্গঠন সম্পন্ন হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
সংগঠনের একাংশের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ইউনিট কমিটি না হওয়া এবং ত্যাগী নেতাকর্মীদের যথাযথ মূল্যায়ন না করায় অসন্তোষ বাড়ছে। অন্যদিকে, পৃথক কর্মসূচি ও শোডাউনকে ঘিরে নেতৃত্বের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়েছে।
এদিকে মহানগর ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ও যুবদল নেতা অ্যাডভোকেট রাকিবুর রহমান সাগরকে ঘিরেও নতুন করে বিতর্কের কথা সামনে এসেছে। মহানগর যুবদলের সম্ভাব্য নতুন কমিটিকে কেন্দ্র করে তাঁর বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন তাঁর অনুসারীরা। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট অন্য পক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে বিষয়টির পূর্ণাঙ্গ চিত্র স্পষ্ট হবে।
নারায়ণগঞ্জ বিএনপির সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে একটি বিষয় স্পষ্ট—বিরোধ কেবল একটি সংগঠন বা নির্দিষ্ট কোনো পদকে ঘিরে সীমাবদ্ধ নেই। আইনজীবী সংগঠন থেকে শুরু করে ছাত্রদল ও যুবদল পর্যন্ত নেতৃত্বের সমন্বয়, কমিটি গঠন এবং সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন নিয়ে নানা প্রশ্ন সামনে আসছে।
স্থানীয় নির্বাচন ঘনিয়ে এলে দলীয় নেতাকর্মীদের সক্রিয়তা, তৃণমূলের সঙ্গে নেতৃত্বের যোগাযোগ এবং সাংগঠনিক ঐক্যের গুরুত্ব আরও বাড়বে। এ অবস্থায় অভ্যন্তরীণ বিরোধ নিরসন, যোগ্য ও সক্রিয় নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন এবং দীর্ঘদিনের কমিটিহীনতা দূর করা দলটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষ করে ছাত্রদল ও যুবদলের মতো মাঠপর্যায়ের সংগঠনগুলোর কার্যকর নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা এবং আইনজীবী সংগঠনগুলোর বিরোধ নিষ্পত্তিতে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহলের অনেকে।
এখন দেখার বিষয়, নারায়ণগঞ্জ বিএনপির স্থানীয় নেতৃত্ব এবং কেন্দ্রীয় দায়িত্বশীলরা এসব বিরোধ নিরসনে কী পদক্ষেপ নেন। নতুন কমিটি গঠন, তৃণমূলের প্রত্যাশার প্রতিফলন এবং দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখার ক্ষেত্রে তাঁদের সিদ্ধান্তই আগামী দিনের সাংগঠনিক পরিস্থিতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।