
নারায়ণগঞ্জে সাম্প্রতিক শ্রমিক অসন্তোষ ও সহিংসতার ঘটনায় জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি মাসুদুজ্জামান মাসুদ। তাঁর মতে, চলমান সংকটে দল দুটির ভূমিকা ব্যবসায়ীদের কাছে ‘প্রশ্নবিদ্ধ, রহস্যজনক ও হতাশাজনক’ মনে হয়েছে। একই সঙ্গে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করতে মালিকপক্ষের পাশাপাশি সরকার ও ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোকেও কার্যকর দায়িত্ব নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) দুপুরে নগরীর চাঁদমারি এলাকায় চেম্বার ভবনে শ্রমিক অসন্তোষ নিয়ে আয়োজিত এক জরুরি মতবিনিময় সভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে এসব কথা বলেন তিনি। সভায় সভাপতিত্ব করেন নারায়ণগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য ও চেম্বারের সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দিপু।
মাসুদুজ্জামান বলেন, শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবি নিয়ে যখন মজুরি বোর্ড গঠনের উদ্যোগ চলছিল, তখনই অপ্রত্যাশিতভাবে শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতা তৈরি হয়। তাঁর দাবি, মালিক কিংবা শ্রমিক—কোনো পক্ষের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়, যার ফলে শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।
তিনি বলেন, ‘দুঃখজনক হলেও সত্যি, এটা আমাদের বাংলাদেশ। কিন্তু বিরোধী দলের যে ভূমিকা, এনসিপি এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা—সেটাও আমাদের কাছে, ব্যবসায়ীদের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ, রহস্যজনক এবং হতাশাজনক মনে হয়েছে। কারণ, এই দেশ তো শেষ পর্যন্ত আমাদেরই। আমাদেরই আসলে সমস্যার সমাধান করতে হবে।’
সাম্প্রতিক তিন দিনের পরিস্থিতিকে অস্বাভাবিক উল্লেখ করে মাসুদুজ্জামান বলেন, মজুরি বোর্ড গঠনের উদ্যোগ নেওয়ার আগেই প্রায় ৬৭ থেকে ৬৮টি কারখানায় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এর পেছনে বিভিন্ন ধরনের ষড়যন্ত্র ও ইন্ধনের বিষয় ব্যবসায়ীরা জানতে পেরেছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
শ্রমিকদের আন্দোলন দমনের পরিবর্তে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাজনৈতিক দলগুলোর সমন্বিত ভূমিকা প্রত্যাশা করেছিলেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছ থেকে ঐক্যবদ্ধ বক্তব্য ও সহযোগিতা পাওয়া গেলে পরিস্থিতি আরও ভালোভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব হতো। শ্রমিকদের প্রতিহত করা নয়, বরং আলোচনার মাধ্যমে সংকটের সমাধানই ছিল ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা।
মজুরি নির্ধারণে মজুরি বোর্ডের সিদ্ধান্তের প্রতি মালিকপক্ষের সমর্থনের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, অতীতেও ব্যবসায়ীরা মজুরি বোর্ড নির্ধারিত বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে আপত্তি করেননি। এবারও সরকার ও মজুরি বোর্ড যে সিদ্ধান্ত নেবে, তার সঙ্গে ব্যবসায়ীরা থাকবেন বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।
ব্যবসা পরিচালনায় বিভিন্ন দপ্তরে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের অভিযোগ তুলে মাসুদুজ্জামান বলেন, এসব অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে ব্যবসায়ীদের জন্য ওয়ান স্টপ সার্ভিস নিশ্চিত করা গেলে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা আরও বাড়ানোর সক্ষমতা তৈরি হবে।
তিনি বলেন, ‘আপনাদের পয়সা না দিলে আমরা শ্রমিকদের ৩০ হাজার টাকা না, আরও ৪০ হাজার টাকা দিতে পারতাম। আমাদের ওয়ান স্টপ সার্ভিস দেন। শ্রমিকদের কত টাকা বেতন দিতে হয়, আমরা দেব।’
ব্যবসায়ীদের ওপর আর্থিক চাপের কথা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, বছরে লাখ লাখ থেকে কোটি কোটি টাকা বিভিন্ন খাতে ব্যয় করতে হয়। এসব অর্থ শ্রমিকদের কল্যাণে ব্যয় করা সম্ভব হলে তাঁদের জীবনমান উন্নয়নে আরও বড় ভূমিকা রাখা যেত।
শ্রমিকদের আবাসন, রেশনিং ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর প্রতি বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান মাসুদুজ্জামান। সংগঠন দুটির ব্যাংকে শত শত কোটি টাকা এফডিআর করে রাখার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, শিল্প খাতে সংকটের সময় এসব অর্থের একটি অংশ শ্রমিক ও মালিকদের সহায়তায় ব্যবহার করা উচিত। শুধু সরকারের কাছে রেশনিং, ডরমিটরি ও চিকিৎসাসেবার দাবি না তুলে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোকেও নিজেদের দায়িত্ব পালন করতে হবে।
শ্রমিক কল্যাণে মালিক ও ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর অংশগ্রহণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে তিনি বলেন, শ্রমিকদের জন্য আবাসন, রেশনিং ও চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থা করা গেলে শিল্প খাত আরও স্থিতিশীল হবে। শ্রমিক সুস্থ ও ভালো থাকলে উৎপাদনের মানও উন্নত হবে।
মাসুদুজ্জামানের ভাষায়, ‘শ্রমিক ভালো থাকলে শিল্পও ভালো থাকবে। শ্রমিক সুস্থ থাকলে প্রোডাক্ট অসুস্থ প্রোডাক্ট বের হবে না।’
বক্তব্যের শেষাংশে শ্রমিকদের বেতন ২৫ হাজার, ৩০ হাজার কিংবা ৩২ হাজার টাকা নির্ধারণের বিষয়টি মালিকপক্ষের একক সিদ্ধান্ত নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, মজুরি কমিশন ও সরকার এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ব্যবসায়ীরা সরকারের পাশে থাকবেন।
তিনি বলেন, শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং শিল্পের স্থিতিশীলতা রক্ষায় সরকার, মালিকপক্ষ, ব্যবসায়ী সংগঠন ও রাজনৈতিক দল—সব পক্ষের সম্মিলিত দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন।