
চট্টগ্রাম প্রতিনিধি
তরুণ প্রজন্মকে সুস্থ ও যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে শুধু উপদেশ বা নির্দেশনা নয়, তাদের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা।
তিনি বলেছেন, অতিরিক্ত মোবাইল ও স্ক্রিননির্ভরতা থেকে তরুণদের বের করে প্রকৃতি ও বাস্তব জগতের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার সুযোগ তৈরি করা জরুরি। এ লক্ষ্যেই শিক্ষার্থীদের প্রকৃতির কাছাকাছি নিয়ে আসতে চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানায় প্লাস্টিক বর্জ্যের বিনিময়ে বিনা মূল্যে প্রবেশের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানায় এ কার্যক্রমের উদ্বোধনকালে জেলা প্রশাসক এসব কথা বলেন।
মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, ‘তরুণ প্রজন্মের প্রতি আমাদের সবার অনেক দায়বদ্ধতা রয়েছে। তাদের সুস্থ মানসিক বিকাশের পরিবেশ আমাদেরই তৈরি করে দিতে হবে। আমি শুধু বললেই হবে না—তুমি সুস্থ হয়ে যাও, তুমি ভালো হয়ে যাও। তার জন্য সেই পরিবেশটাও আমাদের নিশ্চিত করতে হবে।’
জেলা প্রশাসক বলেন, বর্তমান সময়ে তরুণদের একটি বড় অংশ মোবাইল ফোন, অনলাইন ভিডিও ও ভার্চুয়াল জগতের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। দিনের উল্লেখযোগ্য সময় তারা স্ক্রিনের সামনে কাটাচ্ছে। তাদের সেই অভ্যাস থেকে কিছু সময়ের জন্য হলেও প্রকৃতির কাছে ফিরিয়ে আনতে চিড়িয়াখানাকে কেন্দ্র করে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তার ভাষ্য, চিড়িয়াখানায় বাঘ, ভাল্লুক, কুমিরসহ বিভিন্ন প্রাণী শিক্ষার্থীরা সরাসরি দেখার সুযোগ পাবে। অনলাইনে প্রাণীদের ছবি বা ভিডিও দেখার সঙ্গে বাস্তবে তাদের দেখা এবং প্রকৃতির সঙ্গে সরাসরি পরিচিত হওয়ার অভিজ্ঞতার মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে।
জাহিদুল ইসলাম বলেন, অনেক শিক্ষার্থী আর্থিক কারণে চিড়িয়াখানায় যাওয়ার সুযোগ পায় না। এ বিষয়টিও বিবেচনায় নিয়ে ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের জন্য ১০০ গ্রাম প্লাস্টিক বর্জ্যের বিনিময়ে বিনা মূল্যে প্রবেশের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, বর্তমানে চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানায় জনপ্রতি প্রবেশমূল্য প্রায় ৭০ টাকা। নতুন ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদের এ অর্থ দিতে হবে না। এ সুবিধার জন্য আপাতত কোনো সময়সীমাও নির্ধারণ করা হয়নি।
তরুণদের নিয়ে জেলা প্রশাসনের এ উদ্যোগকে ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগ হিসেবে উল্লেখ করে জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা যখন তরুণ প্রজন্মকে গড়ার চিন্তা করব, সেখানে লাভ বা মুনাফা কোনো বিষয় নয়। এটা আমাদের বিনিয়োগ—আমার জন্য, আপনার জন্য, আমাদের দেশের জন্য, আমাদের জাতির জন্য।’
শুধু তরুণদের প্রকৃতির কাছে নিয়ে আসাই নয়, প্লাস্টিক দূষণ সম্পর্কে সচেতনতা তৈরিও এ কর্মসূচির অন্যতম লক্ষ্য বলে জানান জেলা প্রশাসক।
তিনি বলেন, প্রযুক্তির ব্যবহার ও আধুনিকতার সঙ্গে প্লাস্টিকের ব্যবহারও বাড়ছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে কৃষিজমি, সমুদ্র, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর। প্লাস্টিক কৃষিজমিতে জমে মাটির উর্বরতা কমানোর পাশাপাশি চাষাবাদে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। অন্যদিকে সমুদ্রে গিয়ে প্লাস্টিক মাছ, সামুদ্রিক পাখি ও অন্যান্য প্রাণীর জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। মাইক্রোপ্লাস্টিকের মাধ্যমে মানুষের শরীরেও প্লাস্টিক প্রবেশ করছে, যা স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে।
জেলা প্রশাসক বলেন, ‘প্লাস্টিকের ব্যবহার যতটা সম্ভব কমাতে হবে। আর ব্যবহৃত প্লাস্টিক যেন পরিবেশ দূষণ করতে না পারে, সে জন্য সেগুলো সংগ্রহের একটি কার্যক্রম আমরা শুরু করেছি।’
চিড়িয়াখানায় শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা প্লাস্টিক বর্জ্য পুনর্ব্যবহারের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। এ জন্য চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। সমঝোতা হলে সংগৃহীত প্লাস্টিক সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমের সঙ্গে সমন্বয় করে রিসাইক্লিংয়ের আওতায় আনা হবে।
জাহিদুল ইসলাম বলেন, তরুণদের সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি করা শুধু জেলা প্রশাসন বা সরকারের একার দায়িত্ব নয়। পরিবার, সমাজ ও বিভিন্ন বিনোদন ও প্রকৃতিনির্ভর প্রতিষ্ঠানকেও এ ক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে হবে।
তিনি বলেন, ‘সুস্থ প্রজন্ম গড়ে তুলতে হলে শুধু তাদের কাছে প্রত্যাশা করলেই হবে না; তাদের জন্য সেই পরিবেশও আমাদের তৈরি করতে হবে।’
উদ্বোধনী দিনে শতাধিক শিক্ষার্থী ১০০ গ্রাম করে প্লাস্টিক বর্জ্য জমা দিয়ে বিনা মূল্যে চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানা পরিদর্শনের সুযোগ পায়। পরে প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে একটি করে গাছের চারা উপহার দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এলএ) মো. কামরুজ্জামান, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ মাহবুবুল হক, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) পাঠান মো. সাইদুজ্জামান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সাখাওয়াত জামিল সৈকতসহ জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।