
নিউজ ২৪ নারায়ণগঞ্জ
নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি: চাঁদাবাজি, ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ, সংঘর্ষ, অনিয়ম ও দলীয় শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে নারায়ণগঞ্জে বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের একাধিক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কেন্দ্র ও স্থানীয় পর্যায় থেকে বহিষ্কার, পদ স্থগিতসহ নানা ব্যবস্থা নেওয়ার পরও বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে নতুন করে অভিযোগ ওঠায় বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
সর্বশেষ চাঁদাবাজির মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের নারায়ণগঞ্জ মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক সাইফুদ্দিন মোহাম্মদ ফয়সালকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) কৃষক দলের কেন্দ্রীয় সংসদের দপ্তর সম্পাদক মো. শফিকুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, দলীয় নীতি, আদর্শ, শৃঙ্খলা ও সংগঠনবিরোধী কর্মকাণ্ডে সরাসরি জড়িত থাকার ‘সুস্পষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে’ ফয়সালকে প্রাথমিক সদস্যপদসহ দলের সব পর্যায়ের পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। একই সঙ্গে দলীয় নেতাকর্মীদের তার সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ না রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কৃষক দলের কেন্দ্রীয় সভাপতি কৃষিবিদ হাসান জাফির তুহিন ও সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম বাবুল এ সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেছেন।
এর আগে সিদ্ধিরগঞ্জে পদ্মা অয়েল পিএলসির গোদনাইল ডিপোর কর্মীদের কাছে এককালীন ২০ লাখ টাকা এবং প্রতি মাসে ২ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগে দায়ের করা মামলায় ফয়সালকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, গত ১ আগস্ট ফয়সাল অজ্ঞাতনামা ১০-১২ জনকে সঙ্গে নিয়ে ডিপোর জেট-এ-১ পয়েন্টে প্রবেশ করে ওই অর্থ দাবি করেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে আদালতে বিচারিক প্রক্রিয়া চলমান।
ফয়সালের বহিষ্কার নারায়ণগঞ্জে বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক সাংগঠনিক ব্যবস্থার ধারাবাহিকতার সর্বশেষ ঘটনা। এর আগে বিভিন্ন সময়ে চাঁদাবাজি, সংঘর্ষ, দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ, অনৈতিক কর্মকাণ্ড ও সংগঠনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার অভিযোগে আরও কয়েকজন নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
গত ৯ এপ্রিল ফতুল্লার চাঁদনী হাউজিং এলাকায় একটি পোশাক কারখানার ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে যুবদলের দুই পক্ষের সংঘর্ষে এক শিশুসহ তিনজন গুলিবিদ্ধ হন। ওই ঘটনার পর ফতুল্লা থানা যুবদলের আহ্বায়ক মাসুদুর রহমান মাসুদকে প্রাথমিক সদস্যপদসহ সংগঠন থেকে বহিষ্কার করে কেন্দ্রীয় যুবদল।
এরপর মে মাসে চাঁদাবাজির মামলায় গ্রেপ্তার সিদ্ধিরগঞ্জের নাসিক ১ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সালাউদ্দিনকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। দলীয় সিদ্ধান্তে তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, দাঙ্গা-হাঙ্গামা ও জনশৃঙ্খলা বিনষ্টকারী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়।
জুনে এনায়েতনগর ইউনিয়ন যুবদলের চার নেতাকর্মী মো. মামুন, মো. কাউছার, শ্রী নিতাই ও মো. দেলোয়ার হোসেনকে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে বহিষ্কার করা হয়। বিএনপির এক নেতাকে মারধরের ঘটনায় তাদের বিরুদ্ধে এ সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
একই মাসে নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম মান্নানের ছেলে এবং নারায়ণগঞ্জ জেলা যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক খাইরুল ইসলাম সজীবকে প্রাথমিক সদস্যপদসহ সংগঠন থেকে বহিষ্কার করে কেন্দ্রীয় যুবদল। দলীয় বিজ্ঞপ্তিতে তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অনিয়মে জড়িত থাকার অভিযোগের কথা জানানো হয়। এর আগে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছিল।
রূপগঞ্জের কাঞ্চন পৌর বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক কোহিনূর আলমও বহিষ্কারের তালিকায় যুক্ত হন। বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার অভিযোগে জুনের শেষ দিকে জেলা বিএনপি তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়।
আগস্টে সোনারগাঁ উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক আব্দুর রউফ এবং উপজেলা বিএনপির স্বেচ্ছাসেবকবিষয়ক সম্পাদক ও পিরোজপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল জলিলকে বহিষ্কার করা হয়। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও সংগঠনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
৩১ আগস্ট নারায়ণগঞ্জ জেলা কৃষক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক আল আমিন ইকবালকে প্রাথমিক সদস্যপদসহ দলের সব পর্যায়ের পদ থেকে বহিষ্কার করে কেন্দ্রীয় কৃষক দল। বিজ্ঞপ্তিতে তার বিরুদ্ধে দলীয় নীতি, আদর্শ, শৃঙ্খলা ও সংগঠনবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ করা হয়।
সেপ্টেম্বরে সোনারগাঁয়ের জামপুর ইউনিয়নের একটি ওয়ার্ড বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. শুক্কুর আলীকেও দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও পুলিশের এক কর্মকর্তার সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগ ওঠে।
এভাবে কয়েক মাসের ব্যবধানে নারায়ণগঞ্জে বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের একাধিক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। দলীয় সূত্রগুলোর ভাষ্য, সংগঠনের ভাবমূর্তি রক্ষা এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখতে অভিযোগের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে দেওয়া বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বহিষ্কৃত নেতাকর্মীদের ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ডের দায় সংগঠন নেবে না। একই সঙ্গে তাদের সঙ্গে সাংগঠনিক যোগাযোগ না রাখতেও নেতাকর্মীদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ হলেও একই সঙ্গে অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রমাণ যাচাই এবং সাংগঠনিক সিদ্ধান্তের ধারাবাহিক বাস্তবায়ন জরুরি। এতে ব্যক্তির কর্মকাণ্ডের দায় সংগঠনের ওপর না পড়ার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে দলীয় শৃঙ্খলা ও জনআস্থা বজায় রাখা সহজ হবে।
সর্বশেষ সাইফুদ্দিন মোহাম্মদ ফয়সালের বহিষ্কারের ঘটনায় আবারও আলোচনায় এসেছে নারায়ণগঞ্জে বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগ। ধারাবাহিক সাংগঠনিক ব্যবস্থার মধ্যেও নতুন অভিযোগ সামনে আসায় ভবিষ্যতে দলীয় নেতৃত্ব এ বিষয়ে আরও কঠোর অবস্থান নেয় কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।