
সিদ্ধিরগঞ্জে লক্ষ্মীনারায়ণ কটন মিলস সার্বজনীন দুর্গামন্দিরের জমি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ নিরসনে উদ্যোগ নিয়েছে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন (নাসিক) প্রশাসন। মন্দিরে নির্বিঘ্নে পূজা-অর্চনা ও ভক্তদের প্রবেশ নিশ্চিত করতে প্রবেশগেটে নতুন তালা লাগিয়ে উভয় পক্ষের প্রতিনিধিদের হাতে চাবি তুলে দেওয়া হয়েছে। বিরোধের স্থায়ী সমাধানে আগামী ২৬ অক্টোবর নাসিক প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানের নেতৃত্বে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
বুধবার (২১ অক্টোবর) প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী বিজন কান্তি সরকারকে বিষয়টি অবহিত করার পর বিরোধ নিরসনে উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর ধারাবাহিকতায় সাখাওয়াত হোসেন খান মন্দির পরিদর্শন করেন এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি, মন্দির পরিচালনা কমিটির নেতৃবৃন্দ ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করেন।
আলোচনায় মন্দিরে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালনে কোনো ধরনের বাধা সৃষ্টি না করার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়। ভক্তদের নির্বিঘ্নে যাতায়াত নিশ্চিত করতে প্রবেশগেটে নতুন তালা লাগানো হয় এবং উভয় পক্ষের প্রতিনিধিদের হাতে চাবি তুলে দেওয়া হয়। এ সময় সাখাওয়াত হোসেন খান সংশ্লিষ্ট সবাইকে পারস্পরিক সহযোগিতা, সহনশীলতা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বজায় রাখার আহ্বান জানান।
এদিকে, জমি-সংক্রান্ত বিরোধের কারণে দুর্গাপ্রতিমা বিসর্জন না দেওয়ার বিষয়ে মন্দির কমিটির নেওয়া সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানান নাসিক প্রশাসক। ধর্মীয় উৎসবের কর্মসূচি স্বাভাবিকভাবে সম্পন্ন করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আগামী ২৬ অক্টোবর কেন্দ্রীয় ও জেলা পর্যায়ের নেতৃবৃন্দকে নিয়ে বৈঠকের মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি দুর্গাপ্রতিমা বিসর্জনের পর বিকল্প প্রতিমা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নিত্যপূজা অব্যাহত রাখারও অনুরোধ জানান তিনি।
পরে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও উৎসব শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতা চেয়ে স্থানীয় থানায় লিখিত আবেদন করে মন্দির কমিটি।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ নারায়ণগঞ্জ জেলা শাখার সভাপতি শঙ্কর কুমার দে, সাধারণ সম্পাদক শিখন সরকার শিপন, সহসভাপতি তিলোত্তমা দাস, বাংলাদেশ সনাতন পার্টির জেলা শাখার সভাপতি টনি মল্লিক, স্থানীয় বিএনপি নেতা লিয়াকত হোসেন লেকু, যুবদল নেতা সাগর প্রধান এবং লক্ষ্মীনারায়ণ কটন মিলস পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি মিন্টু চন্দ্র দাস ও সাধারণ সম্পাদক বকুল বিশ্বাসসহ সংশ্লিষ্ট নেতৃবৃন্দ।
এর আগে মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) জমি-সংক্রান্ত বিরোধের সমাধান না হওয়ায় এবারের দুর্গোৎসবে প্রতিমা বিসর্জন না দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানান মন্দির কমিটির নেতারা। খবর পেয়ে ওই দিন বিকেলে মন্দির পরিদর্শন করেন সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম ফয়েজ উদ্দিন।
এ সময় মন্দির কমিটির নেতৃবৃন্দ ও স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীরা জমি অবৈধভাবে দখলের অভিযোগ তুলে বিসর্জন না দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানান। ইউএনও তাঁদের বিরোধ নিষ্পত্তির বিষয়ে আগামী ২৬ অক্টোবর বৈঠকে বসার কথা জানান।
স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বী ও লক্ষ্মীনারায়ণ কটন মিলসের শেয়ারহোল্ডারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৯৭২ সালে মিলটি রাষ্ট্রায়ত্ত করা হয়। দীর্ঘদিন লোকসানের পর ২০০০ সালে সরকার কারখানাটির মালিকানা ৫১০ জন শ্রমিক-কর্মচারীর কাছে হস্তান্তর করে। পরবর্তী সময়ে ২০১২ সালে নিট কনসার্ন গ্রুপ বিনিয়োগকারী হিসেবে কারখানাটির পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত হয়।
মন্দির কমিটির পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের কাছে দেওয়া চিঠিতে অভিযোগ করা হয়েছে, নিট কনসার্ন গ্রুপ মন্দির, পুকুর ও মাঠের জমি দখলের চেষ্টা করছে। কমিটির দাবি, বাংলাদেশ হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের নিবন্ধিত মন্দিরটির চারপাশে সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করে ভক্তদের প্রবেশে বাধা সৃষ্টি করা হয়েছে। এ ছাড়া ২০২৩ সালের ১৭ জুন মন্দিরে ভাঙচুরের অভিযোগও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে নিট কনসার্ন গ্রুপের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
মন্দির কমিটির সভাপতি মিন্টু চন্দ্র দাস বলেন, “আমরা প্রত্যাশা করি, আগামী ২৬ অক্টোবরের বৈঠকে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের আলোচনা ও প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগে দীর্ঘদিনের জমি বিরোধের স্থায়ী সমাধান হবে। একই সঙ্গে নির্বিঘ্নে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালনের পরিবেশ নিশ্চিত হবে।”
সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, প্রশাসনের মধ্যস্থতায় নির্ধারিত বৈঠকের মাধ্যমে জমি-সংক্রান্ত বিরোধের সমাধান হবে এবং মন্দিরে ধর্মীয় কার্যক্রম নির্বিঘ্নে পরিচালনার পরিবেশ নিশ্চিত হবে।