নিউজ ২৪ নারায়ণগঞ্জ
নিজস্ব প্রতিবেদক:
নারায়ণগঞ্জে ক্রমেই বাড়ছে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। জেলার সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বেড়ে যাওয়ায় নির্ধারিত শয্যার পাশাপাশি মেঝে ও বারান্দাতেও রোগীদের চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। এতে একদিকে চিকিৎসকদের ওপর বাড়ছে চাপ, অন্যদিকে ভোগান্তিতে পড়ছেন রোগী ও স্বজনরা।
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জে ২ হাজার ৩৮৭ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন ৩৩ জন। চলতি বছরের প্রথম নয় মাসেই আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় পুরো ২০২৫ সালের সংখ্যার কাছাকাছি পৌঁছেছে। ২০২৫ সালে জেলায় মোট ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৩৯৮ জন।
তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাইয়ে নারায়ণগঞ্জে ৩৫ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন। আগস্টে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১১৯ জনে এবং সেপ্টেম্বরে ভর্তি হয়েছেন ১৯৩ জন। অর্থাৎ, সাম্প্রতিক সময়ে আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে।
নারায়ণগঞ্জ জেনারেল (ভিক্টোরিয়া) হাসপাতালেও দেখা দিয়েছে অতিরিক্ত রোগীর চাপ। ১০০ শয্যার এ হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্তদের জন্য পর্যাপ্ত শয্যা না থাকায় মেঝে ও বারান্দায় চিকিৎসা নিতে হচ্ছে অনেককে। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে ২৩ জনের বেশি ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। চলতি বছর এ হাসপাতালে এ পর্যন্ত ৩৭৬ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার সরেজমিনে হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডের বারান্দা ও মেঝেতে অন্তত ১০ জন রোগীকে চিকিৎসা নিতে দেখা যায়। শয্যা সংকটের কারণে তাদের বাধ্য হয়ে বিকল্প স্থানে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।
বন্দর কুড়িপাড়া এলাকার বাসিন্দা আজহারুল ইসলাম (৩১) স্ত্রীকে সন্তান প্রসবের জন্য হাসপাতালে নিয়ে এসে নিজেই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন। গত তিনদিন ধরে তিনি ডেঙ্গু ওয়ার্ডের বারান্দায় চিকিৎসা নিচ্ছেন। একইভাবে দেওভোগ মাদ্রাসা এলাকার মশিউর রহমানও তিনদিন ধরে হাসপাতালের মেঝেতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
মশিউর রহমান বলেন, ওয়ার্ডে শয্যা না থাকায় মেঝেতে থাকতে হচ্ছে। গরমসহ নানা ধরনের অসুবিধা হলেও চিকিৎসার প্রয়োজনেই সেখানে থাকতে হচ্ছে।
হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক (আরএমও) নাজমুল হাসান বিপুল বলেন, বর্তমানে হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর চাপ অনেক বেশি। হাসপাতালটি ১০০ শয্যার হওয়ায় প্রয়োজন অনুযায়ী সবাইকে শয্যা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ফলে মেঝে ও বারান্দায় জায়গা করে রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, কয়েক বছর ধরে নির্দিষ্ট ডেঙ্গু মৌসুমের বাইরেও রোগী শনাক্ত হচ্ছে। ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীকে মশা কামড়ানোর পর সেই মশার মাধ্যমে অন্য ব্যক্তির শরীরেও ভাইরাস ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই আক্রান্ত রোগীদের মশারির মধ্যে রাখা এবং সাধারণ মানুষকে সচেতন হওয়া জরুরি।
এদিকে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন (নাসিক) এলাকাতেও ডেঙ্গুর প্রকোপ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। নাসিকের মেডিকেল অফিসার ডা. শেখ মোস্তফা আলী নিজেও ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে বর্তমানে বাসায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
নাসিকের মেডিকেল অফিসার ডা. নাফিয়া ইসলাম জানান, ডেঙ্গু প্রতিরোধে নিয়মিত মশক নিধন, ওষুধ প্রয়োগ এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে জরিমানাও করা হচ্ছে।
সরকারি হিসাবে চলতি বছর নারায়ণগঞ্জে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা শূন্য। তবে জেলার কয়েকজন বাসিন্দা ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন বলে জানা গেছে। তাদের মধ্যে গত ২৮ আগস্ট ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় রূপগঞ্জ উপজেলা ভূমি অফিসের চেইনম্যান আবু ছিদ্দিক (৫৮) মারা যান।
জেলা সিভিল সার্জন ডা. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, সারাদেশেই ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়েছে। এর প্রভাব নারায়ণগঞ্জের হাসপাতালগুলোতেও পড়েছে। ভিক্টোরিয়া হাসপাতাল ১০০ শয্যার হওয়ায় অতিরিক্ত রোগীদের শয্যা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তবে চিকিৎসা কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
তিনি বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি নাগরিকদেরও সচেতন হতে হবে। বাড়ি ও আশপাশের এলাকায় জমে থাকা পানি অপসারণ, মশার প্রজননস্থল ধ্বংস এবং মশারি ব্যবহারের মাধ্যমে ডেঙ্গুর বিস্তার অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।