
নারায়ণগঞ্জকে নিরাপদ, অপরাধমুক্ত ও শান্তিপূর্ণ জেলা হিসেবে গড়ে তুলতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিভিন্নমুখী কার্যক্রম পরিচালনা করছে জেলা পুলিশ। মাদক, কিশোর গ্যাং, চাঁদাবাজি, ডাকাতি ও সাইবার অপরাধসহ বিভিন্ন অপরাধের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান ও নজরদারি জোরদার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার (এসপি) মো. হাবিবুর রহমান, পিপিএম-সেবা।
দায়িত্ব গ্রহণের পর জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, পুলিশের সক্ষমতা ও বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ নিয়ে সম্প্রতি একান্ত সাক্ষাৎকারে কথা বলেন পুলিশ সুপার। এ সময় তিনি নারায়ণগঞ্জের অপরাধ পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুলিশের কার্যক্রম, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ, মাদকবিরোধী অভিযান এবং জনবান্ধব পুলিশিং ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা তুলে ধরেন।
এসপি হাবিবুর রহমান বলেন, “নারায়ণগঞ্জ একটি বৃহৎ শিল্পাঞ্চল। দেশের বিভিন্ন জেলার মানুষ ব্যবসা, বাণিজ্য ও চাকরির সুবাদে এখানে বসবাস করেন। ফলে এখানে মানুষের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি অপরাধের ধরনও ভিন্ন। আমি এই বৈচিত্র্যকে একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছি। আমার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, দক্ষতা, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণকে কাজে লাগিয়ে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছি।”
তিনি বলেন, ভৌগোলিক ও প্রশাসনিক গুরুত্বের কারণে নারায়ণগঞ্জ একটি গুরুত্বপূর্ণ জেলা। বিপুলসংখ্যক মানুষের বসবাসের বিপরীতে পুলিশের জনবল সীমিত হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়। রাজধানী ঢাকার নিকটবর্তী হওয়ায় অপরাধ সংঘটনের পর অপরাধীদের দ্রুত অন্যত্র চলে যাওয়ার সুযোগও থাকে।
পুলিশ সুপার বলেন, “সময়ের সঙ্গে সাইবার ক্রাইমসহ প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধের নতুন নতুন ধরন যুক্ত হচ্ছে। প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও বিশেষায়িত জনবলের কিছুটা ঘাটতি থাকলেও বিদ্যমান লজিস্টিক সাপোর্ট এবং কর্মকর্তাদের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।”
কিশোর গ্যাং প্রসঙ্গে এসপি হাবিবুর রহমান বলেন, কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার পেছনে শুধু তাদের ব্যক্তিগত দায় দেখলে হবে না। পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, উপযুক্ত পরিবেশের অভাব এবং বিভিন্ন ধরনের নেতিবাচক প্রভাবও এর জন্য দায়ী।
তিনি বলেন, “কিশোর গ্যাং কালচারের জন্য শুধু কিশোরদের দায়ী করলে চলবে না। তাদের পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশও বিবেচনায় নিতে হবে। আমরা স্কুল-কলেজে সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদারের পরিকল্পনা নিয়েছি। পাশাপাশি সন্ধ্যার পর চায়ের দোকান ও বিভিন্ন আড্ডাস্থলে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। কিশোরদের সুপথে ফেরাতে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম ও অভিযান অব্যাহত থাকবে।”
মাদক নিয়ন্ত্রণে জেলা পুলিশের অবস্থান তুলে ধরে পুলিশ সুপার বলেন, নারায়ণগঞ্জে মাদক উৎপাদনের তুলনায় বাইরে থেকে মাদক প্রবেশের বিষয়টি বড় চ্যালেঞ্জ। তাই মাদকের সরবরাহ চেইন ভাঙতে জেলার অভ্যন্তরে যেমন অভিযান প্রয়োজন, তেমনি সীমান্তবর্তী এলাকাতেও কার্যকর নজরদারি জরুরি।
তিনি বলেন, “আমরা জেলার বিভিন্ন গার্মেন্টস অধ্যুষিত ও ঘনবসতিপূর্ণ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে বিশেষ নজরদারি এবং অভিযান পরিচালনা করছি। মাদকের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের আপস করা হবে না।”
পুলিশ সুপার আরও বলেন, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি, সামাজিক সংগঠন, ব্যবসায়ী ও সাধারণ নাগরিকদেরও সহযোগিতা প্রয়োজন। সম্মিলিতভাবে কাজ করা গেলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি একটি নিরাপদ সামাজিক পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব হবে।
নিজের ভবিষ্যৎ লক্ষ্য তুলে ধরে এসপি হাবিবুর রহমান বলেন, “আমার লক্ষ্য একটাই—মানুষ নিশ্চিন্তে রাস্তায় চলাচল করবে, ব্যবসায়ীরা নিরাপদে ব্যবসা করবে এবং রাতে শান্তিতে ঘুমাবে। এমন একটি জনবান্ধব পুলিশিং ব্যবস্থা গড়ে তোলাই জেলা পুলিশের মূল লক্ষ্য।”
তিনি বলেন, অপরাধ দমনে অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সঙ্গে পুলিশের যোগাযোগ আরও বাড়ানো হবে। জনগণের অভিযোগ ও সমস্যাগুলো গুরুত্বের সঙ্গে শুনে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ জানিয়েছে, মাদক, কিশোর গ্যাং, চাঁদাবাজি, ডাকাতি ও প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধসহ বিভিন্ন অপরাধের বিরুদ্ধে অভিযান ও নজরদারি অব্যাহত থাকবে। পুলিশের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সহযোগিতা নিয়ে নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ নারায়ণগঞ্জ গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন পুলিশ সুপার মো. হাবিবুর রহমান।